শৈশবে যে চলনবিল দেখেছিলেন, বর্তমানের সেই রূপের সাথে আর মিল খুঁজে পান না মোহাম্মদ লিটন। নাটোরের সিংড়া উপজেলার চৌগ্রাম ইউনিয়নের বড়িয়া গ্রামে তাঁর বাড়ি। এক সময় আশ্বিন মাস থেকে শুরু করে অগ্রহায়ণ পর্যন্ত গ্রামের চারপাশ পানিতে ঘেরা থাকত, কিন্তু এখন এই সময়ে এলাকাটি প্রায় পানিশূন্য হয়ে পড়ে। লিটনের ভাষায়, ‘ছোটবেলায় চলনবিল আমাদের কাছে ছিল সমুদ্রের মতো। এখন পানি কম, মাছ তো কমছেই।’
বছরের দীর্ঘ সময় পানি ধরে রাখা এই বিশাল জলাভূমি চলনবিলের ভূগর্ভস্থ পানির সম্ভাবনাও এখন তলানিতে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই অঞ্চলের মাত্র ১ শতাংশ এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির সম্ভাবনা ‘খুব বেশি’। ডিসকভার জিওসায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণায় কাজ করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের গবেষকেরা।
রাজশাহী বিভাগের নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলার বিস্তীর্ণ নিম্নভূমির সমন্বয়ে গঠিত এই চলনবিল। বর্ষাকালে এর বিস্তৃতি বাড়লেও শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে গিয়ে অনেক জায়গায় কৃষিজমি জেগে ওঠে। গবেষণার আওতায় নাটোরের সিংড়া ও গুরুদাসপুর, পাবনার চাটমোহর ও ভাঙ্গুড়া এবং সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, রায়গঞ্জ ও উল্লাপাড়া উপজেলাকে রাখা হয়েছে।
ভূগর্ভস্থ পানির সম্ভাব্য এলাকা চিহ্নিত করতে গবেষকেরা অত্যন্ত সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ চালিয়েছেন। তাঁরা স্যাটেলাইটের ছবি, ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা (জিআইএস) এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও ভূতাত্ত্বিক উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন। বৃষ্টিপাত, মাটির ধরন, পানি শোষণক্ষমতা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর, জলাধারের গভীরতা, ভূমির উচ্চতা ও ঢাল, নদী থেকে দূরত্ব, ভূমির ব্যবহার, উদ্ভিদ ও পানির বিস্তার, ভূপ্রকৃতি এবং নদী-নালার ঘনত্বসহ মোট ১৭টি বিষয় বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এছাড়া ১৯৯০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত স্যাটেলাইটের ছবির মাধ্যমে উদ্ভিদের অবস্থার পরিবর্তনও খতিয়ে দেখা হয়েছে।
তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা থেকে ভূমির উচ্চতা ও ঢালের তথ্য, ল্যান্ডস্যাট-৮ স্যাটেলাইট থেকে ভূমির ব্যবহার ও উদ্ভিদের বিস্তার, ক্লাইমেট রিসার্চ ইউনিট থেকে বৃষ্টিপাত এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল থেকে মাটির তথ্য নেওয়া হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছ থেকে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ও জলাধারের গভীরতার তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, মোট ৫ হাজার ৯৭ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে মাত্র ৬৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা ভূগর্ভস্থ পানির ‘খুব বেশি’ সম্ভাবনার শ্রেণিতে পড়ে। ৩ হাজার ৯৩৩ বর্গকিলোমিটার বা ৭৭ শতাংশ এলাকায় সম্ভাবনা মাঝারি এবং ১ হাজার ৯৯ বর্গকিলোমিটার বা ২২ শতাংশ এলাকায় সম্ভাবনা কম।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে গবেষণা দলের সদস্য ওয়াহিদুল আলম বলেন, ‘ভালো বা বেশি সম্ভাবনার এলাকায় বর্ষা মৌসুমে সর্বনিম্ন ৮ মিটার গভীরে পানি পাওয়া যায়। এ মৌসুমে মাঝারি ও কম সম্ভাবনার এলাকায় যথাক্রমে সর্বনিম্ন ১০ ও ১৫ মিটার নিচে পানি পাওয়া যায়। শুকনা মৌসুমে ভালো সম্ভাবনার এলাকায় ২০ মিটারে পানি মেলে। মাঝারি ও কম সম্ভাবনার এলাকায় তা যথাক্রমে ২৫ ও ৪০ মিটার গভীরে।’
গবেষকদের মতে, এই সংকটের পেছনে কেবল প্রাকৃতিক কারণ নয়, বরং বৃষ্টিপাত হ্রাস, ব্যাপক সেচ কার্যক্রমের ফলে পানির স্তর নেমে যাওয়া এবং বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণও দায়ী।
চলনবিলের মাটির গঠন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এলাকার ৪৪ শতাংশে কাদামাটি, ৩৩ শতাংশে এঁটেল দোআঁশ এবং ১৫ শতাংশে পলিমাটি রয়েছে। মোটা ও মাঝারি বালুমাটি আছে ৭ শতাংশের কম এলাকায়। ওয়াহিদুল আলমের মতে, কাদামাটির স্তর ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গবেষণার প্রধান অধ্যাপক চৌধুরী সারোয়ার জাহান জানান, চলনবিলের একদিকে পদ্মা এবং অন্যদিকে যমুনা নদী। বর্তমানে পদ্মার প্রবাহ অনেক কমে গেছে এবং যমুনার পানির পরিমাণও হ্রাস পাচ্ছে। তিনি বলেন, চলনবিলের ভূগর্ভস্থ পানি পদ্মা টেনে নিচ্ছে। আর শুষ্ক মৌসুমে কৃষিতে ব্যাপক হারে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন হচ্ছে। এই দুইয়ে মিলে এখানকার ভূগর্ভস্থ পানি কমছে। তাঁর মতে, জলাভূমিতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া পরিবেশগত বিপর্যয়ের লক্ষণ।
বোরো ধান চাষের জন্য শুষ্ক মৌসুমে সেচের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। ২০টি স্থায়ী পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৫টিতে বর্ষায় পানির স্তর বাড়লেও পরবর্তীতে তা দ্রুত কমে গেছে। ১৯৮৫ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ১৬ জেলার এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রধান ফসলের সেচ-আওতাধীন জমির পরিমাণ ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৬৭৫ হেক্টর থেকে বেড়ে ২৪ লাখ ৪৬ হাজার ৪২৮ হেক্টর হয়েছে।
পানির স্তর দীর্ঘ মেয়াদে নামতে থাকলে সেচের জন্য আরও গভীর থেকে পানি তুলতে হবে, যা পাম্প চালানোর খরচ বাড়িয়ে দেবে। এছাড়া শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমলে মাছ ও জলজ প্রাণীর আবাসস্থলের ওপর প্রভাব পড়তে পারে, যদিও এই গবেষণায় তা সরাসরি মাপা হয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মতিন উদ্দিন খান মনে করেন, বৃষ্টি কমে যাওয়া এবং কৃষি সেচে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার—দুটিই এই সংকটের মূল কারণ। তিনি মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, ‘কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও এ গবেষণায় দেখানো হয়েছে, চলনবিলের মতো জলাভূমিতেও ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সেচে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার আরও বাড়াতে হবে।’
নাটোর জেলার বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ক্ষুদ্র সেচ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯–২০ সালের বোরো মৌসুমে বিদ্যুৎ ও ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র ছিল ৩৬ হাজার ৫০৫টি, যা ২০২৫–২৬ সালে বেড়ে ৪৪ হাজার ২২৯টি হয়েছে। ক্ষুদ্র সেচ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, ‘দিন দিন সেচের পরিমাণ বাড়ছে। এর প্রভাব চলনবিলের ভূগর্ভস্থ পানিতে পড়া অস্বাভাবিক নয়।’
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলনবিল এলাকায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণও কমেছে। ১৯৯০ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত তিন জেলায় গড় বৃষ্টি ছিল ১ হাজার ৫৯৫ মিলিমিটার, যা ২০২৪ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৭০ মিলিমিটারে।