রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাওয়া এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে খাবার ও সেচের পানির তীব্র সংকটে দিশেহারা হতে হয় স্থানীয় মানুষকে। তবে এই সংকট নিরসনে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রশাসনিক দুর্বলতা ও উদাসীনতার বিষয়টি এখানে প্রকট।
বরেন্দ্র অঞ্চলের এই পানিসংকট দূর করতে বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার ভিত্তিতে সরকার তিন জেলার ২৫টি উপজেলার ১৫৩টি ইউনিয়নকে ‘পানিসংকটাপন্ন এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করে ১০ বছরের জন্য একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল। ওই প্রজ্ঞাপনে নতুন গভীর নলকূপ বসানো নিষিদ্ধ করা, দুই বছরের মধ্যে সেচে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার সীমিত করা, পানির অপচয় রোধ এবং খাস জলাশয় ইজারামুক্ত করে বিকল্প উৎস তৈরির মতো মোট ১১টি কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
কিন্তু সংবাদপত্রের বিভিন্ন প্রতিবেদনে মাঠপর্যায়ে এই প্রজ্ঞাপনের প্রয়োগের বাস্তব চিত্র ভিন্ন কথা বলছে। কৃষকদের পানি সাশ্রয়ী ফসলের আবাদে উৎসাহিত করা বা ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমানোর উদ্যোগগুলো সফল হয়নি। পাশাপাশি পুকুর বা খাল ইজারামুক্ত করে বিকল্প সেচের সুযোগ তৈরি করার ক্ষেত্রেও ব্যর্থতা দেখা গেছে।
নিয়ম ভেঙে এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন সংযোগের মাধ্যমে বরেন্দ্র অঞ্চলে গড়ে উঠেছে অসংখ্য গভীর ও শ্যালো নলকূপ। বিশ্লেষকদের মতে, একটি প্রভাবশালী চক্রের মাধ্যমে এখানে পানি দখলের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা মাঠপর্যায়ের চরম অব্যবস্থাপনারই বহিঃপ্রকাশ।
এদিকে, পানিসংকটাপন্ন এলাকা চিহ্নিতকরণ নিয়ে স্থানীয় কর্মকর্তা ও কৃষিবিদদের মনে কিছু প্রশ্ন জেগেছে। এই প্রশ্নগুলোর যথাযথ উত্তর ও সমাধান প্রয়োজন; অন্যথায় সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে অনাস্থার সৃষ্টি হতে পারে।
প্রজ্ঞাপনের সাথে বাস্তবের এই বিশাল ব্যবধানের মূল কারণ হিসেবে প্রশাসনিক উদাসীনতা ও জবাবদিহির অভাবকে দায়ী করা যায়। প্রজ্ঞাপনে বিএমডিএ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং জেলা প্রশাসনসহ একাধিক সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও তদারকির জন্য একক কোনো সংস্থাকে মূল জবাবদিহির ভার দেওয়া হয়নি। ফলে কোনো পক্ষই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী হচ্ছে না।
বরেন্দ্র অঞ্চলের পানির সংকট মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অতি দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, পানির অভাবে সেখানকার মানুষের জীবনযাপন ও পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে। তাই অবিলম্বে একটি শক্তিশালী সমন্বিত টাস্কফোর্স গঠন করে অবৈধ নলকূপ বন্ধ এবং ব্যক্তিগত সেচ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। খাস জলাশয় ইজারামুক্ত করে সারফেস ওয়াটার বা উপরিভাগের পানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে বরেন্দ্রর পরিবেশগত বিপর্যয় ঠেকাতে নীতিমালার পাতা থেকে বেরিয়ে এসে মাঠপর্যায়ে কঠোর আইনি প্রয়োগই এখন একমাত্র পথ।