কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে তাঁতশিল্প আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তার সুফল পাচ্ছেন না কুষ্টিয়ার কুমারখালীর প্রান্তিক তাঁতি ও ব্যবসায়ীরা। প্রায় ৫৮ কোটি ২৭ লাখ টাকা ব্যয়ে কেনা ৮৯টি আধুনিক যন্ত্রপাতির মধ্যে ৫৯টি স্থাপন করা হলেও চালু রয়েছে মাত্র একটি ধাপের যন্ত্র। বাকি তিন ধাপের যন্ত্রপাতি পড়ে আছে অকেজো অবস্থায়। একদিকে নষ্ট হচ্ছে সরকারি অর্থ, অন্যদিকে আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তাঁতিরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, চুক্তি অনুযায়ী এক বছরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা সম্পন্ন করতে প্রায় তিন বছর লেগেছে। পুরোনো যন্ত্রপাতি অপসারণ, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও জায়গার সংকটে নতুন যন্ত্রপাতির একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন খোলা আকাশের নিচে পড়ে ছিল। পরে স্থাপন করা যন্ত্রপাতিরও অধিকাংশের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষ হয়নি। এতে কুমারখালীর ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পের আধুনিকায়ন কার্যত থমকে আছে।
তাঁতিদের অভিযোগ, আধুনিক প্রিন্টিং ও প্রসেসিং সুবিধা না থাকায় উৎপাদিত পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছেন না তারা। বাধ্য হয়ে কাপড় প্রিন্টিং ও প্রসেসিংয়ের জন্য ঢাকায় নিতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ, সময় ও শ্রম বাড়ছে। দ্রুত যন্ত্রপাতিগুলো চালু করে তাঁতশিল্পের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর দাবি জানিয়েছেন তাঁতি ও ব্যবসায়ীরা।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সকালে কুমারখালী তাঁত বোর্ড এলাকা পরিদর্শন করেন জেলা বিএনপির সদস্য সচিব প্রকৌশলী জাকির হোসেন। এ সময় উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক লুৎফর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক রাসেল উদ্দিন বাবুসহ অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
পরিদর্শন শেষে প্রকৌশলী জাকির হোসেন বলেন, “তাঁত বোর্ডের যন্ত্রপাতি পরিদর্শন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জানা গেছে, প্রায় ৮০ শতাংশ যন্ত্রপাতি রয়েছে। তবে ছোটখাটো কিছু যন্ত্রের অভাবে সেগুলো চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। বিষয়গুলো নোট করা হয়েছে। দ্রুত সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। যন্ত্রপাতিগুলো সচল করা গেলে তাঁতিদের ভাগ্য পরিবর্তনের পাশাপাশি এলাকার অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে।”
তাঁত বোর্ড ও খুলনা শিপইয়ার্ড সূত্রে জানা গেছে, কুমারখালীর তাঁতশিল্প আধুনিকায়নে ২০২১-২২ অর্থবছরে ৫৮ কোটি ২৭ লাখ টাকা ব্যয়ে সাইজিং, উইন্ডিং, ডাইং ও ক্যালেন্ডারিংয়ের চার ধাপে ৮৯টি আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপনের প্রকল্প নেয় বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড। যন্ত্রপাতি কেনা ও স্থাপনের দায়িত্ব পায় খুলনা শিপইয়ার্ড।
চুক্তি অনুযায়ী, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে কাজ শুরু করে ওই বছরের জুনে তা শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু নতুন যন্ত্রপাতির সঙ্গে বিদ্যমান অবকাঠামোর সমন্বয় না হওয়া, পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব এবং পুরোনো যন্ত্রপাতি অপসারণ না করায় কাজ বাধাগ্রস্ত হয়। একপর্যায়ে নতুন যন্ত্রপাতির একটি অংশ প্রায় এক বছর খোলা আকাশের নিচে পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় পড়ে থাকে।
পরবর্তী সময়ে কয়েক দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫৯টি যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হলেও বাকি ৩০টি যন্ত্রপাতি স্থাপন ও হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি। এসব যন্ত্রপাতির বাজারমূল্য প্রায় ৩০ কোটি টাকার বেশি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অন্যদিকে, স্থাপন করা ৫৯টি যন্ত্রপাতির মধ্যে সাইজিং, উইন্ডিং ও ডাইং ধাপের যন্ত্রপাতি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়নি। চুক্তি অনুযায়ী, চারটি ধাপের যন্ত্রপাতি স্থাপনের পর ঠিকাদারের প্রায় ছয় মাস পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালানোর কথা ছিল। কিন্তু ক্যালেন্ডারিং ধাপের যন্ত্র ছাড়া বাকি তিন ধাপের যন্ত্রপাতির ট্রায়াল না দিয়েই ঠিকাদার চলে গেছেন বলে অভিযোগ তাঁত বোর্ড কর্তৃপক্ষের।
পদ্মা ও গড়াই নদীবেষ্টিত কুমারখালী উপজেলায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার তাঁতি পরিবার রয়েছে। দেড় শতাধিক বছরের ঐতিহ্যবাহী এই অঞ্চলের তাঁতশিল্প স্থানীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সম্প্রতি কুমারখালীর বেডশিট ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, উপজেলায় প্রতি মাসে প্রায় আড়াই থেকে তিন লাখ পিস বেডশিট ও তোয়ালে তৈরি হয়। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এসব পণ্য দেশের বিভিন্ন বাজার এবং বিদেশেও যায়।
এমন সম্ভাবনাময় শিল্পকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে আধুনিকায়ন প্রকল্প নেওয়া হলেও যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত পড়ে থাকায় প্রত্যাশিত সুফল মিলছে না। দ্রুত অবশিষ্ট যন্ত্রপাতি স্থাপন, ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থার সমাধান এবং সব ধাপের যন্ত্রপাতি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করে উৎপাদনে ব্যবহারের ব্যবস্থা না হলে সরকারি বিনিয়োগের সুফল পাওয়া কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কুমারখালীর তাঁতশিল্পকে এগিয়ে নিতে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি সচল করা। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কার্যকর উদ্যোগই পারে এই বিনিয়োগকে কাজে লাগিয়ে প্রান্তিক তাঁতিদের উৎপাদন খরচ কমাতে, পণ্যের মান বাড়াতে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা তৈরি করতে।
কুমারখালী তাঁত বোর্ডের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মেহেদী হাসান বলেন, “সাইজিং, উইন্ডিং, ডাইং ও ক্যালেন্ডারিংয়ের চার ধাপের যন্ত্রপাতি স্থাপনে এক বছর সময় নির্ধারিত থাকলেও খুলনা শিপইয়ার্ড প্রায় তিন বছরে কাজ শেষ করেছে। তবে চার ধাপের মধ্যে কেবল ক্যালেন্ডারিং যন্ত্রের ট্রায়াল দেওয়া হয়েছে। বাকি তিন ধাপের যন্ত্রপাতির ট্রায়াল না দিয়েই ঠিকাদার চলে গেছেন।”
তিনি আরও বলেন, “হস্তান্তরের পর প্রায় ছয় মাস পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালানোর কথা থাকলেও ঠিকাদার আর ফিরে আসেননি। বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও খুলনা শিপইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ কিংবা সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি পড়ে থাকলেও তাঁতিরা আধুনিক সুবিধা পাচ্ছেন না।”