ভোটের সময় দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা নিজেদের ‘মোর দ্যান ইসলামিক’ হিসেবে উপস্থাপন করেন বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ। তরুণ আলেমদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “ভোট এলে সবাই একটু বেশি কৃষক হয়ে যান, একটু বেশি আলেম হয়ে যান।”

কুমিল্লা–৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ মনে করেন, রাজনৈতিক নেতারা এই ধরণের আচরণের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এই প্রেক্ষাপটে তিনি তরুণ আলেমদের সতর্ক করে বলেন, ‘দীর্ঘ মেয়াদে আমাদের নিজস্ব রাজনীতি নির্মাণ করতে হবে। আমরা যেন আরেকজনের রাজনীতির ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত না হই, আরেকজনের গেমের (খেলা) ঘুঁটি যেন আমরা না হই। বরং আমরা যেন নিজস্ব গেমের প্লেয়ার (খেলোয়াড়) হতে পারি।’

আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে আয়োজিত ইসলামি বইমেলার একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্স (এনসিপির সহযোগী সংগঠন) এর উদ্যোগে প্রকাশিত পত্রিকা ‘তুরাস’-এর প্রথম সংখ্যার (উত্তরাধিকার, পর্ব–১) মোড়ক উন্মোচন উপলক্ষে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এই প্রকাশনাটি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী এবং তাঁর পরবর্তী আমির আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর স্মরণে উৎসর্গ করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে হাসনাত আবদুল্লাহ উল্লেখ করেন যে, ২০০৮ সালের নির্বাচন পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আলেম ও ওলামাদের ওপর চরম নির্মম অত্যাচার চালানো হয়েছিল। তবে সেই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো একাডেমিক কাজ হয়নি। তাই ওলামা অ্যালায়েন্সের প্রকাশিত এই বইটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

আলেমদের পেশাগতভাবে বহুমুখী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে হাসনাত বলেন, কওমি সনদের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। তিনি চান, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে আলেমরা যেন রাষ্ট্রের মূলধারার পেশায় অংশগ্রহণ করেন এবং জাতীয় ক্ষেত্রে যথাযথ ভূমিকা পালন করেন। জুলাই বিপ্লব যে সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে, সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে তা কাজে লাগানোর কথা বলেন তিনি। পাশাপাশি বিভাজন ভুলে আলেমদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্য ধর্মাবলম্বীরা অনিরাপদ হয়ে পড়বে—এমন প্রচারণার যে মিথ্যা, তা বাস্তব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রমাণ করার পরামর্শ দেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি আলেমদের পরমতসহিষ্ণু হওয়ার পাশাপাশি নিজস্ব গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তৃতায় তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সব সময় একটা কার্ড খেলত যে তারা যদি না থাকে, তাহলে বাংলাদেশে থাকা অন্য ধর্মাবলম্বীরা অন্যদের কাছে, অর্থাৎ আমাদের কাছে অনিরাপদ। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সারা দেশে অন্য ধর্মের উপাসনালয়গুলো রাত জেগে পাহারা দিয়ে আমাদের আলেম–ওলামা ভাইয়েরা প্রমাণ করে দিয়েছেন আওয়ামী লীগ মিথ্যার ওপর রাজনীতি করেছে।’

দেশের মাদ্রাসা শিক্ষা এবং আলেম-ওলামাদের ‘এক্সট্রিমিস্ট’ (উগ্রবাদী) বা প্রতিক্রিয়াশীল হিসেবে চিহ্নিত করে বাংলাদেশ অনিরাপদ বলে যে বয়ান ৫ আগস্টের পর থেকে প্রচারের চেষ্টা করা হচ্ছে, তা মিথ্যা বলে দাবি করেন হাসনাত। তিনি আলেমদের উদ্দেশে বলেন, ‘এটা যে মিথ্যা, তা আমাদের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করতে হবে। আপনাদের ১ নম্বর দায়িত্ব হচ্ছে, অন্য ধর্মের যাঁরা আছেন, তাঁদের ধর্মীয় আচার–আচরণ, কালচার–কৃষ্টি যেন তাঁরা যথাযথভাবে পালন করতে পারেন, সেদিকে লক্ষ রাখা।’

আসন্ন দুর্গাপূজার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সামনে পূজা, একটা বৃহত্তর প্রোগ্রাম (উৎসব)। এ ছাড়া অন্যান্য ধর্মেরও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড থাকে। এই জায়গাগুলোতে আমাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা যেটা আমরা পালন করে আসছি, তা অব্যাহত রাখতে হবে।’

হাসনাত আবদুল্লাহর দ্বিতীয় পরামর্শ ছিল, আলেমদের ‘পরমতসহিষ্ণু নন’—এই অভিযোগ যেন কেউ করতে না পারে। তিনি বলেন, ‘৫ আগস্টের পরে এসে ভিন্নমতের সঙ্গে আমাদের তর্কবিতর্ক হবে, কথা হবে। কিন্তু কোনোভাবেই যেন এই ট্যাগটা এই আওয়ামী সেট–আপের মিডিয়া দিতে না পারে, সেটা আমাদের দায়িত্ব ও কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করতে হবে। আমাদের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে, আমাদের নিজস্ব গণমাধ্যম তৈরি করতে হবে।’

বক্তৃতার পর হাসনাত আবদুল্লাহসহ এনসিপি ও ওলামায়ে অ্যালায়েন্সের নেতারা ‘তুরাস’-এর প্রথম সংখ্যার মোড়ক উন্মোচন করেন। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন প্রয়াত জুনায়েদ বাবুনগরীর ব্যক্তিগত সহকারী এনামুল হাসান, তাকওয়া চ্যারিটি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান গাজী ইয়াকুব, হেফাজতে ইসলামের পল্টন জোনের সাধারণ সম্পাদক মুফতি ইমরানুল বারী সিরাজী, মুক্তকণ্ঠের ধর্ম বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক মনযূরুল হক, ওলামা অ্যালায়েন্সের আহ্বায়ক আশরাফ উদ্দিন মাহদী এবং সদস্যসচিব সানাউল্লাহ খান।