বিজ্ঞানীদের দাবি, জিন থেরাপি বা জিনভিত্তিক বিশেষ চিকিৎসার মাধ্যমে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের দৃষ্টিশক্তি আংশিকভাবে ফিরিয়ে আনা এখন সম্ভব। 'অপ্টোজেনেটিক' নামক এই চিকিৎসা পদ্ধতিটি সম্পূর্ণ নিরাপদ বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা। দীর্ঘ গবেষণার পর এই আশাব্যঞ্জক তথ্যগুলো সামনে এসেছে।
গত বৃহস্পতিবার চিকিৎসাবিজ্ঞানের মর্যাদাপূর্ণ সাময়িকী 'নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন'-এ এই সংক্রান্ত গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে। এই জিনভিত্তিক চিকিৎসায় আলো ব্যবহার করে স্নায়ুকোষকে সক্রিয় কিংবা নিষ্ক্রিয় করার এক বিশেষ কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, এই ধরনের আবিষ্কারের জন্যই চলতি বছর চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে।
মানুষের শরীরের বংশগতির ধারক হিসেবে কাজ করে জিন। ২০২১ সালে প্রথমবারের মতো অপ্টোজেনেটিক জিন থেরাপির মাধ্যমে একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তির দৃষ্টিশক্তি আংশিকভাবে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল। এবার গবেষকেরা আরও বড় পরিসরে এই পরীক্ষাটি পরিচালনা করেছেন। এবারের পরীক্ষায় প্রথম ওই রোগীর পাশাপাশি আরও নয়জন ব্যক্তি অংশ নিয়েছেন।
গবেষণাপত্রটির লেখক এবং সুইজারল্যান্ডের ইনস্টিটিউট অব মলিকিউলার অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল অপথালমোলজি বাসেলের পরিচালক অধ্যাপক বোটন্ড রোশকা বলেন, ‘আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে অপ্টোজেনেটিকস ধারণাটি কার্যকর। এখন লক্ষ্য হলো দৃষ্টিশক্তি আরও বেশি ফেরানোর দিকে এগিয়ে যাওয়া। তা হয়তো ৫-১০ বছরের মধ্যে অর্জিত হবে।’
এই গবেষণায় অংশগ্রহণকারী ১০ জন ব্যক্তিই 'অ্যাডভান্সড রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসায়' আক্রান্ত ছিলেন। এই রোগের কারণে রেটিনার যেসব কোষ আলো শনাক্ত করতে পারে, সেগুলো ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। তবে রেটিনায় থাকা গ্যাংলিয়ন নামের কোষগুলো তুলনামূলকভাবে দেরিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই গ্যাংলিয়ন কোষগুলোর প্রধান কাজ হলো চোখ থেকে প্রাপ্ত দৃশ্য-সংক্রান্ত তথ্য মস্তিষ্কে প্রেরণ করা।
জিন থেরাপির প্রক্রিয়ায় চোখে একটি ইনজেকশন দেওয়া হয়, যার ফলে গ্যাংলিয়ন কোষগুলো পুনরায় আলো শনাক্ত করার ক্ষমতা ফিরে পায়। এরপর রোগীদের একটি বিশেষ ধরনের চশমা পরানো হয়। এই চশমাটি রোগীর চারপাশের দৃশ্য ধারণ করে সেটিকে নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোর ঝলকে রূপান্তর করে। এই আলোর ঝলক গ্যাংলিয়ন কোষগুলোকে সক্রিয় করে তোলে, যার ফলে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি তাঁর সামনের দৃশ্যের সাদাকালো ছবি দেখতে পান।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের হ্যানকিংস বলেন, ‘যেসব মানুষের কিছুটা দৃষ্টিশক্তি এখনো অবশিষ্ট আছে, তাঁদের জন্য এই গবেষণা আশ্বস্ত হওয়ার মতো বিষয়। আমরা দেখেছি যে আপাতত কিছুটা হলেও দৃষ্টিশক্তি স্থায়ীভাবে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব।’