চিকিৎসাবিজ্ঞানে অত্যন্ত বিরল এক ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইল বাংলাদেশ। মাছ ধরতে গিয়ে এক জেলের পায়ুপথ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে একটি জীবন্ত বাইম মাছ, যা পরবর্তীতে অন্ত্রের দেয়াল ফুটো করে পেটের ভেতরে চলে যায়। তীব্র পেটব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে জরুরি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ২৬ ইঞ্চি লম্বা মাছটিকে জীবিত উদ্ধার করেন চিকিৎসকেরা।
এই অদ্ভুত ও বিরল ঘটনাটি নিয়ে ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব সার্জারি কেস রিপোর্টস’-এ একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়, ঘটনার শিকার ব্যক্তি বাংলাদেশের একজন ৫৫ বছর বয়সী জেলে। মাছ ধরার একদিন পর তিনি তীব্র পেটব্যথায় ভোগেন। হাসপাতালে চিকিৎসকদের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান, মাছ ধরার সময় একটি বাইম মাছ প্রথমে তার লুঙ্গির ভেতর ঢোকে এবং পরবর্তীতে পায়ুপথ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে। মাছটি নিজে থেকেই বেরিয়ে যাবে বলে মনে করে তিনি তাৎক্ষণিক কোনো চিকিৎসা নেননি।
হাসপাতালে পরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা রোগীর পেট শক্ত হয়ে যাওয়া এবং চাপ দিলে তীব্র ব্যথার পাশাপাশি পেরিটোনাইটিসের লক্ষণ শনাক্ত করেন। এক্স-রে পরীক্ষায় পেটের ভেতর অস্বাভাবিক গ্যাস জমার চিহ্ন এবং ইলের একটি অস্পষ্ট ছায়া দেখা যায়, যা থেকে অন্ত্র ফুটো হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
পরিস্থিতি গুরুতর হওয়ায় এবং সেপটিসেমিয়ার ঝুঁকি এড়াতে দ্রুত অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসকেরা। পেট কাটার পর দেখা যায়, সিগময়েড কোলনের সামনের দেয়ালে ছিদ্র হয়ে একটি বাইম মাছ পেটের ভেতরে চলে গেছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় ছিল, মাছটি তখনো জীবিত ছিল।
অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পেটের ভেতর থেকে প্রায় ২৬ ইঞ্চি লম্বা বাইম মাছটিকে জীবিত বের করা হয়। চিকিৎসকদের ধারণা, অন্ত্রের দেয়াল ফুটো করার পর মাছটি পেটের ভেতরে গিয়ে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছিল। পেটের ভেতরে মলজাতীয় পদার্থও পাওয়া যায়, যা পরে স্বাভাবিক স্যালাইন দিয়ে পরিষ্কার করা হয়।
অন্ত্রের ক্ষত সারাতে রোগীর সিগময়েড কলোস্টোমি করা হয়। অস্ত্রোপচারের পর কোনো জটিলতা দেখা না দেওয়ায় হাসপাতালে ভর্তির চার দিন পর তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়।
চিকিৎসকদের মতে, জীবন্ত কোনো প্রাণীর কারণে, বিশেষ করে মাছের কারণে অন্ত্র ফুটো হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। চিকিৎসাবিজ্ঞানের নথিতে এর আগে মাত্র একটি নজির পাওয়া গেছে, যা ২০০৪ সালে হংকংয়ে ৫০ বছর বয়সী এক ব্যক্তির ক্ষেত্রে ঘটেছিল। বাংলাদেশের এই ঘটনাটিকে ইলের কারণে অন্ত্র ফুটো হওয়ার দ্বিতীয় নথিভুক্ত ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অস্বাভাবিক পেটব্যথা নিয়ে আসা রোগীর ক্ষেত্রে তার পেশা, সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড এবং কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেছে কি না—সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য নেওয়া জরুরি। কারণ অনেক সময় বিব্রতকর পরিস্থিতির কারণে রোগীরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করতে পারেন।
গবেষণাপত্রে আরও বলা হয়েছে, অন্ত্র ফুটো হওয়ার সন্দেহ থাকলে দ্রুত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদান করা জরুরি। এক্স-রে ও অন্যান্য পরীক্ষা এ ধরনের জটিলতা শনাক্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গুরুতর পেরিটোনাইটিস বা সেপসিসের লক্ষণ থাকলে দ্রুত অস্ত্রোপচারই জীবনহানির ঝুঁকি কমাতে পারে।