সাম্প্রতিক গবেষণায় এক চমকপ্রদ তথ্য সামনে এসেছে। দেখা গেছে, গত ১৫০ বছরে মানুষের শরীরের গড় তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। বর্তমানে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের গড় স্বাভাবিক তাপমাত্রা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৬.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৯৭.৫২ ডিগ্রি ফারেনহাইটে।
সাধারণত আমরা জানি যে, একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৯৮.৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট। এই মানদণ্ডটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল জার্মান চিকিৎসক কার্ল উন্ডারলিচের সংগৃহীত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে। ১৮৬০-এর দশকে যখন থার্মোমিটারের ব্যবহার এখনকার মতো নিয়মিত ছিল না, তখন উন্ডারলিচ দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে বিভিন্ন বয়সের প্রায় ২৫ হাজার নারী-পুরুষের বগলের তাপমাত্রা পরিমাপ করেন। এভাবে তিনি ১০ লাখেরও বেশি তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন।
এই বিশাল তথ্যভাণ্ডার বিশ্লেষণ করে উন্ডারলিচ সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের গড় তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস হিসেবে নির্ধারণ করেন। সেই হিসেবে তাপমাত্রা যদি ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ১০০.৪ ডিগ্রি ফারেনহাইটের ওপরে চলে যায়, তবে তাকে জ্বরের লক্ষণ হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে বর্তমান সময়ের গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এই গড় তাপমাত্রা আগের চেয়ে কমেছে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সংক্রামক রোগবিশেষজ্ঞ জুলি পারসনেটের মতে, উন্ডারলিচ যে তথ্যগুলো সংগ্রহ করেছিলেন, তার অধিকাংশ উৎস ছিল শ্রমজীবী রোগী। বিপরীতে, বর্তমান সময়ে উন্নত জীবনযাত্রার কারণে মানুষের বেশির ভাগ সময় কাটে একটি আদর্শ পরিবেশে, যাকে বলা হয় ‘থার্মাল-নিউট্রাল জোন’ বা তাপীয়-নিরপেক্ষ অঞ্চল। এই বিশেষ পরিবেশে শরীরের তাপমাত্রা বজায় রাখার জন্য শরীরকে বাড়তি কোনো পরিশ্রম করতে হয় না। আর শরীর যখন পরিশ্রম করে না, তখন শক্তি উৎপন্ন হয় না এবং ফলস্বরূপ তাপও তৈরি হয় না।
তাপমাত্রা কমে যাওয়ার এই প্রবণতা কেবল উন্নত দেশগুলোর মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সুইজারল্যান্ডের জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের জৈবিক নৃতত্ত্ববিদ অ্যাড্রিয়ান জায়েগির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আমাজন রেইনফরেস্টে বসবাসকারী আধা যাযাবর আদিবাসী জনগোষ্ঠী সিমানেদের শরীরের গড় তাপমাত্রা ২০০০ সালের শুরুর দিকে ছিল প্রায় ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু গত দুই দশকে আর্থসামাজিক অবস্থার দ্রুত উন্নতির ফলে ২০১৮ সালে তাদের শরীরের গড় তাপমাত্রা কমে হয়েছে ৩৬.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা শরীরের তাপমাত্রা কমে যাওয়ার পেছনে বেশ কিছু সম্ভাব্য কারণ চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো সামগ্রিকভাবে মানুষের স্বাস্থ্যের উন্নতি এবং গড় আয়ুর বৃদ্ধি। উন্ডারলিচের সময়ে মানুষের গড় আয়ু ছিল মাত্র ৩৮ বছর, যা বর্তমানে প্রায় দ্বিগুণ। তৎকালীন মানুষ বর্তমানের মতো স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করতেন না এবং যক্ষ্মা, আমাশয়, বাতজ্বর বা হাড়ের সংক্রমণের মতো নানা জটিল রোগে ভুগতেন। রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা যখন এসব প্রাণঘাতী রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করত, তখন শরীর থেকে প্রচুর ক্যালরি খরচ হতো, আর ক্যালরির এই খরচই তাপে রূপান্তরিত হতো। সিমানে জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও টিকা এবং উন্নত স্যানিটেশন-ব্যবস্থার কারণে স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটেছে, যা তাপমাত্রা হ্রাসে ভূমিকা রেখেছে।
এছাড়া ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৮৮ শতাংশ বাড়িতে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং যুক্তরাজ্যের প্রায় সমান সংখ্যক বাড়িতে সেন্ট্রাল হিটিং বা কেন্দ্রীয় উষ্ণায়ন-ব্যবস্থা রয়েছে।
তবে মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা ইতিহাসবিদ এবং সংক্রামক রোগবিশেষজ্ঞ ফিলিপ ম্যাককোয়াক সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি মত দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, উন্ডারলিচের পরিমাপ পদ্ধতিতেই ত্রুটি ছিল। ম্যাককোয়াক জানান, উন্ডারলিচের ব্যবহৃত একটি কাচের থার্মোমিটার সরাসরি পরীক্ষা করার সুযোগ তাঁর হয়েছিল। তিনি লক্ষ করেন, সেগুলোর পরিমাপের মান বা ক্যালিব্রেশন আধুনিক থার্মোমিটারের তুলনায় প্রায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। অর্থাৎ ওই যন্ত্রগুলো দিয়ে নেওয়া যেকোনো তাপমাত্রার রিডিং প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি দেখাত। ম্যাককোয়াক জানান, সে সময়ে শরীরের তাপমাত্রা পরিমাপ করা ছিল বেশ কষ্টসাধ্য ও জটিল। এ ছাড়া তখন মুখের ভেতর থার্মোমিটার না রেখে বগলের নিচে তাপমাত্রা পরিমাপ করা হতো, যা আজকের প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে আলাদা।
শরীরের তাপমাত্রা আরও কিছু বিষয়ের ওপর নির্ভর করে:
১. বয়স: বয়স্ক ব্যক্তিদের শরীরের তাপমাত্রা তুলনামূলক কম থাকে। ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সংক্রামক রোগবিশেষজ্ঞ ওয়ালিদ জাভেদ বলেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের বিপাকক্রিয়া বা মেটাবলিজম ধীর হয়ে যায়, শরীর আগের মতো সক্রিয় থাকে না, ফলে শক্তির ব্যবহারও কমে যায়।
২. লিঙ্গ: পুরুষদের তুলনায় নারীদের শরীরের তাপমাত্রা কিছুটা বেশি থাকে। ঋতুচক্রের প্রভাবের কারণে এমনটা হতে পারে। অনেক বয়স্ক নারীর ক্ষেত্রেও শরীরের তাপমাত্রা বেশি দেখা যায়, যার প্রকৃত কারণ বিজ্ঞানীদের কাছে এখনো অজানা।
৩. দিনের সময়: ভোরবেলা শরীরের তাপমাত্রা কমে যায়। বোস্টন চিলড্রেনস হসপিটাল ও ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হসপিটালের রিউমাটোলজিস্ট জোনাথন হাউসমান জানান, শরীরের তাপমাত্রার একটি সার্কাডিয়ান রিদম বা দৈনিক ছন্দ রয়েছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, রাত তিনটা থেকে ভোর পাঁচটার মধ্যে তাপমাত্রা কমে যায় এবং বিকেল চারটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। সম্ভবত দিনের বেলা শারীরিক সক্রিয়তা বেড়ে যাওয়ার কারণেই এমনটা ঘটে।
৪. উচ্চতা ও ওজন: উচ্চতা বাড়লে তাপমাত্রা কমে আর ওজন বাড়লে কিছুটা বাড়ে। পারসনেটের মতে, উচ্চতা বেশি হলে শরীরের পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল বাড়ে। ফলে শরীর থেকে বেশি তাপ বেরিয়ে যেতে পারে এবং তাপমাত্রা কিছুটা কমে। অন্যদিকে শরীরের ওজন বেশি হলে তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসকে আদর্শ তাপমাত্রা ধরা হলেও এখন তা পুনর্বিবেচনার সময় এসেছে বলে মনে করছেন চিকিৎসাবিশেষজ্ঞরা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দুটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস— চিকিৎসকদের বহুল ব্যবহৃত বই ‘হ্যারিসনস প্রিন্সিপলস অব ইন্টারনাল মেডিসিন’ এবং অনলাইন চিকিৎসা তথ্যভান্ডার ‘আপ-টু-ডেট’-এ এই প্রচলিত মানদণ্ড পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞই একটি নির্দিষ্ট মানের ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব না দেওয়ার পরামর্শ দেন।
তাঁরা মনে করেন, ৩৬.৯৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ৩৭.০১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে কোনো আকাশ-পাতাল পার্থক্য নেই, যার ভিত্তিতে একটিকে স্বাভাবিক এবং অন্যটিকে অস্বাভাবিক বলা যায়। তবে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরের তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৯৬ ডিগ্রি ফারেনহাইটের নিচে নেমে গেলে কিংবা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইটের ওপরে উঠলে তা গুরুতর শারীরিক সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।