রাতে দেরি করে ঘুমাতে যাওয়া, কাজের চাপে কম ঘুমানো বা ঘনঘন ঘুম ভেঙে যাওয়ার অভ্যাস শরীরের ওপর নানা প্রভাব ফেলতে পারে। সম্প্রতি কিছু গবেষণা বলছে, এর মধ্যে হাড় ও গাঁটের স্বাস্থ্যের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত রাতে ছয় ঘণ্টার কম ঘুমান বা ঘুমের সমস্যায় ভোগেন, তাদের হাঁটু ও নিতম্বের অস্টিওআর্থ্রাইটিসের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে।

অস্টিওআর্থ্রাইটিস হলো গাঁটের এমন একটি সমস্যা, যেখানে গাঁটের তরুণাস্থি ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে। এতে ব্যথা, শক্ত হয়ে যাওয়া এবং নড়াচড়া করতে অসুবিধা হতে পারে। তবে গবেষণায় ঘুমের সঙ্গে এই রোগের ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেলেও, কম ঘুম সরাসরি অস্টিওআর্থ্রাইটিস ঘটায়, এমন সিদ্ধান্ত এখনই দেওয়া যায় না।

কম ঘুমের সঙ্গে গাঁটের সমস্যার সম্পর্ক কী?

২০২৬ সালে Arthritis Care & Research সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় যুক্তরাজ্যের প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষকেরা ঘুমের সময়, অনিদ্রার সমস্যা এবং রাতের পালায় কাজ করার সঙ্গে হাঁটু ও নিতম্বের অস্টিওআর্থ্রাইটিসের সম্পর্ক খতিয়ে দেখেন।

গবেষণায় দেখা যায়, যারা রাতে ছয় ঘণ্টার কম ঘুমান, তাদের প্রায় সাত ঘণ্টা ঘুমানো ব্যক্তিদের তুলনায় হাঁটু ও নিতম্বের অস্টিওআর্থ্রাইটিসের ঝুঁকি ২০ থেকে ৪০ শতাংশ বেশি। যারা নিয়মিত ঘুমাতে অসুবিধা বা ঘুম ধরে রাখতে সমস্যার কথা জানিয়েছেন, তাদের মধ্যেও এ রোগের ঝুঁকি বেশি দেখা গেছে।

তবে এটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণা। অর্থাৎ, গবেষকেরা মানুষের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে ঘুম ও গাঁটের সমস্যার মধ্যে সম্পর্ক খুঁজেছেন। তাই কম ঘুমই যে সরাসরি অস্টিওআর্থ্রাইটিসের কারণ, তা এই গবেষণা থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

ঘুম কম হলে গাঁটের ক্ষতি হতে পারে কেন?

ঘুমের সঙ্গে শরীরের বিভিন্ন পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া জড়িত। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে প্রদাহ, ব্যথা অনুভব করার প্রবণতা এবং শরীরের বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন ঘটতে পারে। এসব পরিবর্তন গাঁটের স্বাস্থ্যের ওপর কীভাবে প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে গবেষণা চলছে।

কম ঘুম ও গাঁটের সমস্যার মধ্যে সম্পর্কের কয়েকটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা আছে।

শরীরে প্রদাহ বাড়তে পারে: দীর্ঘদিন ঘুমের সমস্যা থাকলে শরীরের প্রদাহ নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ অস্টিওআর্থ্রাইটিসের মতো রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে কম ঘুমের কারণে গাঁটে প্রদাহ কতটা বাড়ে, তা আরও গবেষণার বিষয়।

ব্যথা বেশি অনুভূত হতে পারে: পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরের ব্যথা সামলানোর ক্ষমতা প্রভাবিত হতে পারে। ফলে আগে থেকে গাঁটে সমস্যা থাকলে ব্যথা বেশি অনুভূত হতে পারে। আবার গাঁটের ব্যথার কারণেও রাতে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে।

ওজন বৃদ্ধির প্রভাব থাকতে পারে: ঘুমের অভাব ক্ষুধা ও বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে কিছু মানুষের ওজন বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। শরীরের অতিরিক্ত ওজন হাঁটু ও নিতম্বের গাঁটে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যা অস্টিওআর্থ্রাইটিসের একটি পরিচিত ঝুঁকির কারণ।

গবেষকেরা শরীরের ওজনসহ অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় নেওয়ার পরও ঘুমের সঙ্গে অস্টিওআর্থ্রাইটিসের সম্পর্ক দেখতে পেয়েছেন। তবে এর পেছনের সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া পুরোপুরি বোঝার জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন।

অস্টিওআর্থ্রাইটিসের লক্ষণ কী?

অস্টিওআর্থ্রাইটিস সাধারণত হাঁটু, নিতম্ব ও হাতের গাঁটে বেশি দেখা যায়। এর কিছু সাধারণ লক্ষণ হলো-

গাঁটে ব্যথা, বিশেষ করে নড়াচড়া বা কাজ করার সময়।

গাঁট শক্ত হয়ে যাওয়া, বিশেষ করে বিশ্রামের পর।

গাঁট ফুলে যাওয়া বা স্পর্শ করলে অস্বস্তি হওয়া।

হাঁটাচলা, সিঁড়ি ওঠানামা বা দৈনন্দিন কাজ করতে অসুবিধা।

গাঁট নড়ানোর সময় ঘষা লাগার মতো অনুভূতি বা শব্দ হওয়া।

এসব লক্ষণ দেখা দিলেই অস্টিওআর্থ্রাইটিস হয়েছে, এমন না। অন্য রোগেও গাঁটে ব্যথা হতে পারে। ব্যথা দীর্ঘদিন থাকলে, ক্রমে বাড়লে বা দৈনন্দিন কাজে বাধা সৃষ্টি করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

রাতে কত ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন?

প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত প্রতি রাতে অন্তত সাত ঘণ্টা ঘুমের পরামর্শ দেওয়া হয়। অনেক প্রাপ্তবয়স্কের জন্য সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুম উপযুক্ত। তবে বয়স, শারীরিক অবস্থা ও ব্যক্তিভেদে ঘুমের প্রয়োজন কিছুটা আলাদা হতে পারে।

ঘুমের সময় শুধু গুরুত্বপূর্ণ না, ঘুমের মানও গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত ঘুম ভেঙে যাওয়া, ঘুম আসতে দীর্ঘ সময় লাগা বা ঘুমিয়েও ক্লান্ত বোধ করা ঘুমের সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।

ঘুমের সময় ঠিক রাখতে কয়েকটি অভ্যাস সহায়ক হতে পারে-

প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমাতে যান এবং ঘুম থেকে উঠুন।

ঘুমের আগে মোবাইল ও কম্পিউটারের ব্যবহার কমান।

বিকেল বা সন্ধ্যার পর চা-কফি কমিয়ে দেখুন।

শোবার ঘর শান্ত, অন্ধকার ও আরামদায়ক রাখুন।

নিয়মিত হাঁটাচলা ও শরীরচর্চা করুন।

ঘুমের সমস্যা দীর্ঘদিন চললে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

পর্যাপ্ত ঘুম শরীরের সামগ্রিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু ঘুমের সময় বাড়ালেই গাঁটের রোগ প্রতিরোধ করা যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

রাতের পালায় কাজ করলে কি ঝুঁকি বাড়ে?

দিন-রাতের স্বাভাবিক সময়সূচির বাইরে কাজ করলে শরীরের জৈবিক ঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদমে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণায় রাতের পালায় কাজ করার সঙ্গে হাঁটুর অস্টিওআর্থ্রাইটিস এবং হাঁটু প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচারের ঝুঁকির সম্পর্কও পাওয়া গেছে।

তবে রাতের পালায় কাজ করেন এমন প্রত্যেকের গাঁটের রোগ হবে, এমনটা না। কাজের ধরন, শারীরিক পরিশ্রম, ওজন, আগের আঘাত এবং ঘুমের মানসহ অনেক বিষয় এই ঝুঁকিকে প্রভাবিত করতে পারে।

রাতের পালায় কাজ করলে ঘুমের জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখা, ঘুমানোর জায়গা অন্ধকার ও শান্ত করা এবং সম্ভব হলে নিয়মিত ঘুমের রুটিন বজায় রাখা উপকারী হতে পারে।

রাতে ছয় ঘণ্টার কম ঘুমানো এবং ঘুমের সমস্যার সঙ্গে হাঁটু ও নিতম্বের অস্টিওআর্থ্রাইটিসের ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে সাম্প্রতিক গবেষণায়। তবে এই সম্পর্কের অর্থ এই নয় যে কম ঘুমালেই গাঁটের রোগ হবে। ঘুমের অভাবের পাশাপাশি বয়স, ওজন, আগের গাঁটের আঘাত ও অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

তাই নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তোলা, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং শরীরচর্চা করা ভালো। একই সঙ্গে গাঁটে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা বা শক্ত হয়ে থাকার সমস্যা দেখা দিলে শুধু ঘুমের অভাবকে দায়ী না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

তথ্যসূত্র

Samaa TV: Sleeping under six hours linked to joint problems, study finds

Washington University in St. Louis: Poor sleep and night shift work linked to higher risk of osteoarthritis

PubMed: Associations of Sleep and Shift Work With Osteoarthritis Risk

PubMed: Association between sleep duration and musculoskeletal pain