কাটাছেঁড়া ছাড়াই মায়ের গর্ভে থাকা এক শিশুর বুকের মারাত্মক টিউমার সংকুচিত করতে সক্ষম হয়েছেন চীনের একদল চিকিৎসক। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, যা আগামী দিনে হাজার হাজার শিশুর জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জানা গেছে, গর্ভস্থ শিশুটি ফুসফুসের একটি জন্মগত ও জিনগত ত্রুটিতে আক্রান্ত ছিল। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয় ‘সিপিএএম’ (সিপাম)। চিকিৎসকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত প্রতি ২৫ থেকে ৩৫ হাজার গর্ভধারণের মধ্যে মাত্র একটি ক্ষেত্রে এমন ত্রুটি দেখা যায়।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই ধরনের ত্রুটি বা টিউমার খুব বেশি মারাত্মক রূপ নেয় না। তবে কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে টিউমারটি অত্যন্ত দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং আকারে অনেক বড় হয়ে যায়। এর ফলে শিশুটির হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুস মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়ে, যা গর্ভেই শিশুর মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি করে।
বর্তমানে এই রোগের জন্য কোনো নির্দিষ্ট আদর্শ চিকিৎসা পদ্ধতি নেই। কিছু ক্ষেত্রে টিউমারের আকার ছোট করার লক্ষ্যে গর্ভবতী মাকে স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ প্রদান করা হয়।
আবার বিরল কিছু ক্ষেত্রে যখন এই টিউমারে তরল পদার্থে পূর্ণ বড় সিস্ট বা থলি তৈরি হয়, তখন চিকিৎসকেরা মায়ের পেট ও জরায়ুর ভেতর দিয়ে সুই প্রবেশ করিয়ে একটি ড্রেনেজ টিউব বা নল যুক্ত করেন। এই নলের মাধ্যমে সিস্টের তরল বাইরে বের করে দেওয়া হয়। তবে যেসব ক্ষেত্রে এই নল ব্যবহার করা হয়, তাদের একটি বড় অংশে সময়ের আগে শিশুর জন্ম নেওয়ার ঝুঁকি থাকে। এর বাইরে ‘ফিটাল লোবেক্টমি’ নামের আরেকটি পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে।
এই পদ্ধতিতে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জরায়ু কেটে গর্ভস্থ শিশুকে বের করে টিউমার অপসারণ করা হয় এবং পরবর্তীতে শিশুটিকে পুনরায় জরায়ুর ভেতর ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তবে এটি অত্যন্ত বড় ধরনের ও জটিল একটি অস্ত্রোপচার। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া সান ফ্রান্সিসকোর এক গবেষণা অনুযায়ী, এই জটিল অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যাওয়া মায়েদের সন্তানদের বেঁচে থাকার হার মাত্র ৫০ শতাংশ।
চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকী আলট্রাসাউন্ড ইন অবস্টেট্রিকস অ্যান্ড গাইনোকোলজিতে সাম্প্রতিক এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, চীনের চিকিৎসকেরা ৪০ বছর বয়সী এক মায়ের গর্ভে থাকা শিশুর বড় টিউমারটি ছোট করতে অত্যন্ত আধুনিক ও ‘ন্যূনতম আক্রমণাত্মক’ একটি প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন।
গর্ভধারণের ২২তম সপ্তাহে শিশুটির টিউমার প্রায় ৫ সেন্টিমিটার বড় হয়ে গিয়েছিল। আকার এতটাই বড় ছিল যে তা শিশুর হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসকে চেপে ধরছিল। চিকিৎসকেরা শিশুটির পেটে বিপজ্জনক মাত্রায় তরল জমে থাকার বিষয়টিও লক্ষ করেন।
ঝুঁকি এড়াতে চিকিৎসকেরা মায়ের পেটের ওপর দিয়ে একটি ছোট সুই গর্ভস্থ শিশুর ফুসফুসের টিউমারে প্রবেশ করান। এরপর সেই সুইয়ের মাধ্যমে জরায়ুর ভেতরে ‘মাইক্রোওয়েভ এনার্জি’ বা তরঙ্গ পাঠিয়ে অস্বাভাবিক কোষগুলো উত্তপ্ত ও ধ্বংস করা হয়।
এই পদ্ধতিটি মূলত টিউমারের ভেতরের পানির অণুগুলোকে কম্পনের মাধ্যমে প্রচণ্ড তাপ সৃষ্টি করে, যার ফলে টিউমারটি ভেতর থেকে ধ্বংস হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়ার মাত্র তিন দিনের মাথায় টিউমারটি উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়ে আসে এবং একই সঙ্গে শিশুর তলপেটে জমে থাকা তরলও পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে যায়।
গর্ভধারণের ৩৭তম সপ্তাহে সিজারিয়ান সেকশনের (সি-সেকশন) মাধ্যমে শিশুটি পৃথিবীতে আসে। জন্মের সময় তার ওজন ছিল প্রায় ২ দশমিক ৯ কিলোগ্রাম।
চিকিৎসকেরা এই ‘ন্যূনতম আক্রমণাত্মক’ পদ্ধতিকে এক নতুন মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেছেন। গর্ভস্থ শিশুর সিপিএএম নিরাময়ে ‘মাইক্রোওয়েভ অ্যাবলেশন’ পদ্ধতির ব্যবহার এটাই প্রথম।
তবে চিকিৎসকেরা বিশেষভাবে জোর দিয়ে বলেছেন, “পদ্ধতিটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় হলেও একটি ঘটনার ওপর ভিত্তি করে এর নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।”
তারা আরও জানান, “ভবিষ্যতে যদি এ পদ্ধতি নিরাপদ, আবার প্রয়োগযোগ্য ও কার্যকর প্রমাণিত হয়, তবে এটি সিপিএএমের মতো জটিল রোগীদের চিকিৎসায় একটি চমৎকার বিকল্প হয়ে উঠবে।”