চলতি বছরের ডিসেম্বরের আগেই ভারতের সঙ্গে গঙ্গা চুক্তি সম্পন্ন হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। এই চুক্তির ক্ষেত্রে মূল অগ্রাধিকার হিসেবে ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে থাকা ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ পুনরায় ফিরিয়ে আনার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আগামী বছরের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি অথবা মার্চের মধ্যে পদ্মা ব্যারাজের কাজ দৃশ্যমান হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এ ছাড়া তিস্তা বহুমুখী প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডি বা সম্ভাব্যতা যাচাই প্রক্রিয়া শেষ করে আগামী বছর থেকে সরকার এই প্রকল্পের মূল কাজ শুরু করতে আগ্রহী।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ঢাকায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) আয়োজিত ‘পানির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন ভাবনা : তরুণ নেতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও সহযোগিতা’ শীর্ষক এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সেমিনার শেষে সাংবাদিকদের করা বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এসব প্রত্যাশার কথা ব্যক্ত করেন।
মন্ত্রী উল্লেখ করেন, পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি মেগা প্রজেক্ট। তিনি বলেন, “পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রজেক্ট। এটি বাংলাদেশের জন্য মাস্টারমাইন্ড প্রজেক্ট; যেখানে বাংলাদেশের মোট অঞ্চলের তিন ভাগের এক ভাগ মানুষ এর সুফল পাবে।”
পদ্মা ব্যারাজের বর্তমান অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি জানান, এই প্রকল্পের কাজ দৃশ্যমান করার জন্য একনেকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা আশা করছি আগামী জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি বা মার্চের যেকোনো এক সময়ে কাজ দৃশ্যমান হবে।”
তিস্তা মহাপরিকল্পনার চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, এটি একটি খরস্রোতা নদী। ভারত থেকে উজানের পানি যেভাবে ভাটি এলাকায় প্রবাহিত হচ্ছে, দীর্ঘকাল ধরে ওই অঞ্চলের মানুষ সেই চ্যালেঞ্জের সঙ্গে লড়াই করে জীবনধারণ করছে। তিনি আরও জানান, এই মহাপরিকল্পনা নিয়ে ইতিপূর্বে প্রচুর সেমিনার হয়েছে এবং বর্তমানেও হচ্ছে।
প্রকল্পের কারিগরি দিক নিয়ে কথা বলে তিনি জানান, বুয়েটের বিশেষজ্ঞ সদস্যদের সঙ্গে তিনি আলোচনা ও বৈঠক করেছেন এবং প্রয়োজনীয় দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। দেশি-বিদেশি অনেক বিশেষজ্ঞের সঙ্গেও কথা বলা হয়েছে, কারণ এই ধরনের কাজে কারিগরি সহায়তা বা টেকনিক্যাল সাপোর্ট অত্যন্ত জরুরি।
শিগগিরই এই প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডি বা সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শুরু করতে হবে বলে জানান শহীদউদ্দীন চৌধুরী। তিনি বলেন, “স্টাডির ভিত্তিতেই আমরা প্রজেক্টের কাজ শুরু করব। আমরা আশা করছি, এটি সম্পূর্ণ করতে কিছুটা সময় লাগবে। ২০২৭ সালের মধ্যে সব শেষ করে যেন ২০২৭ সালে মূল কাজ শুরু করা যায়, সেদিকে আমাদের বিশেষ নজর রয়েছে।”
গঙ্গা চুক্তি প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, এই চুক্তি নিয়ে সবাই বেশ উদগ্রীব। ২০২৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বর্তমান ৩০ বছরের চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ১৯৭৭ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জীবদ্দশায় প্রথম ৫ বছরের জন্য যে চুক্তি হয়েছিল, তাতে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ ছিল। তবে ১৯৯৬ সালে চুক্তিটি নবায়ন করার সময় সেই গ্যারান্টি ক্লজটি বাদ দেওয়া হয়।
আগামী ১২ ডিসেম্বরের আগেই নতুন চুক্তি সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, “সেই অনুযায়ী বাংলাদেশ এবং ভারত উভয় পক্ষ যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বৈঠকের ভিত্তিতে আমরা আশাবাদী যে ২০২৬ সালের ১২ ডিসেম্বরের আগেই চুক্তি সম্পন্ন হবে। সেখানে আমাদের মূল অগ্রাধিকার থাকবে ১৯৭৭ সালের চুক্তির মতো ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ ফিরিয়ে আনা।”
পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা প্রকল্পে বহির্বিশ্বের কোনো চাপ বা প্রতিবন্ধকতা অনুভব করছেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পদ্মা ও তিস্তার তীরের মানুষগুলো এ দেশেরই নাগরিক। দেশের মানুষের স্বার্থ ও চাপই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় বিষয়। সেই চাপকে ধারণ করে দেশের মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করাই সরকারের মূল লক্ষ্য বলে তিনি জানান।
পদ্মা ব্যারাজের দীর্ঘসূত্রিতার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এই প্রকল্পের স্টাডি সম্পন্ন করতেই ২০০৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় লেগেছিল এবং পরবর্তী সময়ে তা আর বাস্তবায়িত হয়নি। তবে তিনি দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই বিষয়টি চূড়ান্ত করে কাজ হাতে নিয়েছেন।
তিস্তার মতো মেগা প্রজেক্টের স্টাডি রাতারাতি বা দু-এক মাসে সম্ভব নয় বলে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, অতীতে যারা দায়িত্বে ছিলেন, তারা পর্যাপ্ত টেকনিক্যাল সাপোর্ট নিয়ে কাজ শেষ করেননি। তবে সরকার নিজস্ব উদ্যোগে এই কাজ সম্পন্ন করে প্রকল্পটিকে দৃশ্যমান রূপ দেবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।