চলতি বছরের ডিসেম্বরের আগেই গঙ্গা চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। তিনি জানান, নতুন চুক্তির ক্ষেত্রে মূল অগ্রাধিকার হবে ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে বিদ্যমান ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ পুনরায় ফিরিয়ে আনা।
রাজধানীতে বৃহস্পতিবার ‘পানির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন ভাবনা: তরুণ নেতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও সহযোগিতা’ শীর্ষক একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস-বিস) তাদের নিজস্ব মিলনায়তনে এই সেমিনারের আয়োজন করে। অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পানিসম্পদমন্ত্রী এই প্রত্যাশার কথা জানান।
শহীদউদ্দীন চৌধুরী জানান, আগামী বছরের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি অথবা মার্চের মধ্যে পদ্মা ব্যারাজের কাজ দৃশ্যমান হবে। পাশাপাশি তিস্তা বহুমুখী প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডি বা সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ করে আগামী বছর থেকে সরকার মূল কাজ শুরু করার পরিকল্পনা করছে।
প্রকল্প দুটির গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, ‘পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রজেক্ট এবং বাংলাদেশের জন্য মাস্টারমাইন্ড প্রজেক্ট। যেখানে বাংলাদেশের মোট অঞ্চলের তিন ভাগের এক ভাগ মানুষ এর সুফল পাবে। পদ্মা ব্যারাজের কাজ দৃশ্যমান করার জন্য একনেকে পাস হয়েছে। আমরা আশা করছি, আগামী জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি বা মার্চের যেকোনো এক সময়ে কাজ দৃশ্যমান হবে।’
তিস্তা প্রকল্পের চ্যালেঞ্জ নিয়ে তিনি মন্তব্য করেন, ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। এটি একটি খরস্রোতা নদী। ভারত থেকে উজানের পানি যেভাবে ভাটি এলাকায় আসছে, দীর্ঘদিন থেকে এই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে ওই অঞ্চলের মানুষ জীবনধারণ করছে। আমরা এই মহাপরিকল্পনার নামে যা আলোচনা করছি, এটা নিয়ে প্রচুর সেমিনার হয়েছে এবং হচ্ছে। বুয়েটের যেসব বিশেষজ্ঞ সদস্য রয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছি, মিটিং করেছি এবং দায়িত্ব দিয়েছি। দেশি-বিদেশি অনেক বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলেছি। কারণ, তাঁদের কারিগরি সহায়তা বা টেকনিক্যাল সাপোর্ট নেওয়া আমাদের জন্য খুবই প্রয়োজন।’
পরিকল্পনার সময়সীমা সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন, ‘খুব শিগগির এর ফিজিবিলিটি স্টাডির কাজ হাতে নিতে হবে। স্টাডির ভিত্তিতেই আমরা প্রজেক্টের কাজ শুরু করব। আমরা আশা করছি, এটি সম্পূর্ণ করতে কিছুটা সময় লাগবে। ২০২৭ সালের মধ্যে সব শেষ করে যেন ২০২৭ সালে মূল কাজ শুরু করা যায়, সেদিকে আমাদের বিশেষ নজর রয়েছে।’
গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ নিয়ে তিনি উল্লেখ করেন যে, ২০২৬ সালের ১২ ডিসেম্বর এই ৩০ বছরের চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। তিনি মনে করিয়ে দেন, ১৯৭৭ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়ে প্রথম পাঁচ বছরের জন্য যে চুক্তি হয়েছিল, তাতে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে ১৯৯৬ সালে চুক্তিটি নবায়নের সময় ওই গ্যারান্টি ক্লজটি বাদ দেওয়া হয়।
এই বিষয়ে মন্ত্রী আরও বলেন, ‘১২ ডিসেম্বরের আগেই আমাদের নতুন চুক্তি করতে হবে। সেই অনুযায়ী বাংলাদেশ এবং ভারত উভয় পক্ষ যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বৈঠকের ভিত্তিতে আমরা আশাবাদী যে ২০২৬ সালের ১২ ডিসেম্বরের আগেই চুক্তি সম্পন্ন হবে। সেখানে আমাদের মূল অগ্রাধিকার থাকবে ১৯৭৭ সালের চুক্তির মতো গ্যারান্টি ক্লজ ফিরিয়ে আনা।’
পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা প্রকল্পে আন্তর্জাতিক কোনো চাপ বা প্রতিবন্ধকতার বিষয়ে জানতে চাইলে শহীদউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘পদ্মা ও তিস্তার পাড়ে যাঁরা বাস করেন, তাঁরা আমাদের দেশেরই মানুষ। আমার দেশের মানুষের স্বার্থ ও চাপই আমার কাছে সবচেয়ে বড় চাপ। সেই চাপকে ধারণ করে দেশের মানুষের কল্যাণ করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।’
প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রিতার কারণ ব্যাখ্যা করে মন্ত্রী বলেন, ‘পদ্মা ব্যারাজের সমীক্ষা সম্পন্ন করতেই ২০০৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় লেগেছিল। পরবর্তী সময়ে তা আর বাস্তবায়িত হয়নি। আমরা দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে তা চূড়ান্ত করে কাজ হাতে নিয়েছি। তিস্তার মতো বৃহদায়তন প্রকল্পের সমীক্ষা রাতারাতি বা এক-দুই মাসে সম্ভব নয়। অতীতে যাঁরা দায়িত্বে ছিলেন, তাঁরা পর্যাপ্ত কারিগরি সহায়তা নিয়ে কাজ শেষ করেননি। তাই আমাদের সরকার নিজ উদ্যোগেই এই কাজ সম্পন্ন করে প্রকল্পটিকে দৃশ্যমান রূপ দেবে।’
অন্যদিকে, ভারতের সঙ্গে পানিবণ্টন বিষয়ে সহযোগিতার লক্ষ্যে বাংলাদেশ একটি কমিটি গঠন করেছে এবং ভারতের প্রতিনিধিদের নাম চাওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। বিসের সেমিনার উদ্বোধনের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এই তথ্য প্রদান করেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা প্রত্যাশা করে এবং এই বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান রয়েছে। পানি সমস্যা সমাধানে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে কার্যকর সংলাপ ও যোগাযোগ অত্যন্ত জরুরি।
তিনি জানান, এই লক্ষ্যেই বাংলাদেশ একটি কমিটি গঠন করেছে এবং ভারতের প্রতিনিধিদের নাম চাওয়া হয়েছে। গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ভারতের কাছে নাম চেয়েছি, যাতে আমাদের প্রতিনিধিরা তাদের সঙ্গে সংলাপ ও আলোচনা শুরু করতে পারেন। এখন আমাদের তাদের জবাবের অপেক্ষা করতে হবে।’
ভারতের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে হুমায়ুন কবির বলেন, খুব দ্রুতই এ বিষয়ে জবাব পাওয়া যেতে পারে। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা এগিয়ে যাবে এবং পরবর্তী দফার পানি চুক্তি নবায়নের পথ প্রশস্ত হবে।
পরিশেষে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দুই দেশের নেতৃত্বের মধ্যে সহযোগিতার মানসিকতা থাকলে আলোচনার মাধ্যমে বন্ধুত্বপূর্ণ সমাধান সম্ভব। কূটনীতি ও সংলাপের মাধ্যমেই এসব জটিল বিষয় সমাধান করতে হবে।