বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের মধ্যে বিরাজমান অসন্তোষ এবং চলমান বিক্ষোভের বিষয়ে গভীরভাবে নজর রাখছে ভারত। পরিস্থিতির বর্তমান গতিপ্রকৃতি কোন দিকে মোড় নেয়, সে বিষয়ে দেশটির বিশেষ দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে। আজ মঙ্গলবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল এই তথ্য জানিয়েছেন।
বাংলাদেশে পোশাক শ্রমিকদের এই আন্দোলন যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তা কি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনায় কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে—এমন প্রশ্নের প্রেক্ষিতেই জয়সোয়াল এই প্রতিক্রিয়া জানান। তবে পোশাক শিল্প শ্রমিকদের নির্দিষ্ট দাবি-দাওয়া, আন্দোলনের ধরন কিংবা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি কেবল সংক্ষিপ্তভাবে বলেন, ‘এটা ঠিক, সে দেশে কিছু ঘটনা ঘটছে। পরিস্থিতির গতিপ্রকৃতির দিকে নজর রাখা হচ্ছে।’
একই ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বেশ কিছু স্পর্শকাতর প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এক বিক্ষোভ সমাবেশে ভারতবিরোধী স্লোগান দেওয়ার ঘটনাটি ভারত কীভাবে দেখছে, তা জানতে চাওয়া হয় এক সাংবাদিকের মাধ্যমে। এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে জয়সোয়াল কেবল জানান যে, এ ধরনের ঘটনার প্রতি সব সময় নজর রাখা হয়।
অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক সহকারী মো. রাশেদ খাঁনের সাম্প্রতিক একটি বক্তব্য নিয়ে ভারতের অবস্থান জানতে চাওয়া হয়। সাংবাদিক উল্লেখ করেন যে, রাশেদ খাঁন দাবি করেছেন জামায়াত ও আওয়ামী লীগের সহযোগিতায় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বাংলাদেশে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টা করছে। এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে ভারত সরকারের মনোভাব জানতে চাওয়া হলে জয়সোয়াল কোনো সরাসরি জবাব দেননি। তিনি কেবল বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার কিছুই বলার নেই।’
পুরো ব্রিফিং জুড়ে বাংলাদেশ সংক্রান্ত প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অত্যন্ত সতর্ক ও সংযত ভূমিকা পালন করেন। নতুন সরকার গঠনের পর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুরোপুরি স্বাভাবিক হচ্ছে কি না এবং বাংলাদেশ ক্রমশ চীন ও পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে পড়ছে কি না—এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি পূর্বের দেওয়া উত্তরটিই পুনরায় ব্যক্ত করেন। জয়সোয়াল বলেন, ‘আমি আগেও বলেছি এখনো বলছি, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত একটি ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যৎ–মুখী সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী। এটাই আমাদের প্রত্যাশা। সেই প্রত্যাশা পূরণের লক্ষ্যেই আমরা এগোতে চাই।’
বাংলাদেশের একজন বিরোধীদলীয় নেতার সতর্কবার্তা সম্পর্কেও ভারতের প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হয়। ওই নেতা তারেক রহমান সরকারকে সতর্ক করে বলেছেন যে, ভারতকে যেন ট্রানজিট করিডর দেওয়া না হয়। পাশাপাশি গঙ্গা চুক্তি বিষয়েও তিনি সরকারকে সতর্ক করে বলেছেন, নতুন চুক্তি যেন বাংলাদেশের জন্য ন্যায্য হয়। এই মন্তব্যের বিপরীতে কোনো পাল্টা প্রতিক্রিয়া না দিলেও গঙ্গা চুক্তি নিয়ে ভারত সরকারের দীর্ঘদিনের অবস্থানের কথা মনে করিয়ে দেন জয়সোয়াল। তিনি বলেন, ‘আমি আগেও বলেছি, দুই দেশের মধ্যে প্রবাহিত গঙ্গাসহ যত নদী আছে তার পানিসম্পদ ভাগাভাগি ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে যৌথ নদী কমিশন (জেআরসি) রয়েছে। তার কাঠামোতেই অভিন্ন নদীসংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় আলোচিত হয়।’ তিনি আরও জানান, এ বিষয়ে বর্তমানে নতুন করে বলার কিছু নেই।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই প্রশ্নোত্তর পর্ব থেকে এটি স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারত এমন কোনো মন্তব্য বা সমালোচনা করতে ইচ্ছুক নয় যা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বরং ভারত বারবার ইতিবাচক, গঠনমূলক এবং ভবিষ্যৎ-মুখী সম্পর্কের কথা গুরুত্ব দিয়ে জানিয়েছে। এই কারণেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর চূড়ান্ত হয়েও কেন বাস্তবায়িত হচ্ছে না, সেই প্রশ্নের কোনো নির্দিষ্ট উত্তর দেননি রণধীর জয়সোয়াল। তিনি শুধু জানান, সফর সংক্রান্ত নতুন কোনো তথ্য থাকলে তা জানানো হবে।