কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে ভারতের ত্রিপুরা আর এপারে কুমিল্লার গোমতীপাড়ের জনপদ। সীমান্তঘেঁষা এই এলাকাগুলোতে দীর্ঘদিনের দারিদ্র্য, বেকারত্ব, কর্মসংস্থানের তীব্র সংকট এবং শিক্ষার অভাবের সঙ্গে মাদক ও চোরাচালানের বিস্তারের এক গভীর যোগসূত্র দেখছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, জীবিকার জন্য নিরাপদ ও বৈধ সুযোগ সীমিত হওয়ায় সীমান্তের কিছু মানুষ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের দিকে ঝুঁকছেন। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এবং নারীদের একটি অংশ এই ঝুঁকির মুখে রয়েছেন।
ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে উৎপন্ন হয়ে গোমতী নদী সীমান্ত পেরিয়ে কুমিল্লার বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া, দেবিদ্বার, মুরাদনগর, কুমিল্লা সদর ও সদর দক্ষিণসহ বিভিন্ন এলাকা অতিক্রম করে দাউদকান্দির দিকে গিয়ে মেঘনায় মিশেছে। কুমিল্লার জীবনযাত্রা, কৃষি ও অর্থনীতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকা এই নদী একদিকে যেমন মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস, অন্যদিকে বিভিন্ন সময়ে ভাঙন, বন্যা ও চরম দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গোমতীবিধৌত কুমিল্লার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর মধ্যে বুড়িচং উপজেলার সংকুচাইল একটি উল্লেখযোগ্য জনপদ। ভারতের সীমান্তঘেঁষা এই গ্রামের কাছেই ভারতের ‘নগর’ নামক একটি এলাকা অবস্থিত। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া থাকলেও চোরাচালানের বিভিন্ন গোপন পথকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে এখানে এক ভিন্ন ধরনের সামাজিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।
কুমিল্লার প্রায় ১২৫ কিলোমিটার ভারতীয় সীমান্তের অধিকাংশ অংশে কাঁটাতারের বেড়া থাকলেও সংকুচাইলসহ বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকায় মানুষের অবাধ চলাচল ও পণ্য পাচারের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিনের দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের সংকটের কারণেই অনেকে এই ঝুঁকিপূর্ণ ও অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন।
দারিদ্র্য থেকে মাদকের ঝুঁকি
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সংকুচাইল এলাকার অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে মাদক ও চোরাচালানের বিস্তারের একটি সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে। অনুন্নত কৃষিব্যবস্থা, শিল্প-কারখানার স্বল্পতা, কারিগরি জ্ঞানের অভাব, মূলধনের সংকট, নিরক্ষরতা, অদক্ষ জনশক্তি এবং কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ—সব মিলিয়ে অনেক পরিবার নিয়মিত আয়ের নিশ্চয়তা থেকে বঞ্চিত।
বিশেষ করে সীমান্তবর্তী গোমতীর পাড়ের নারীরা তুলনামূলক বেশি সুবিধাবঞ্চিত অবস্থায় রয়েছেন। স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ কম এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগও সীমিত। অনেক পরিবারে শিক্ষার হার কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নেই। ফলে পরিবারের অর্থনৈতিক সংকটে নারীদের একটি অংশ চোরাচালান বা মাদক পরিবহনের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে সহায়তা করছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
অল্প বয়সেই মাদকের হাতছানি
মাদক পরিস্থিতির আরেকটি উদ্বেগজনক দিক উঠে এসেছে ব্যবহারকারীদের বয়সসংক্রান্ত তথ্যে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩৩ শতাংশ মাদক ব্যবহারকারী ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সেই প্রথম মাদক গ্রহণ করেন। আর ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সে প্রথম মাদক গ্রহণ করেন প্রায় ৫৯ শতাংশ।
অর্থাৎ, মাদকের সংস্পর্শে আসার ক্ষেত্রে কিশোর ও তরুণদের ঝুঁকি তুলনামূলক অনেক বেশি। স্থানীয়দের মতে, সীমান্তবর্তী এলাকায় মাদকের সহজলভ্যতা, পারিবারিক ও সামাজিক নজরদারির ঘাটতি এবং কর্মসংস্থানের সংকট এই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
চিকিৎসা চান অধিকাংশ, সুযোগ পান অল্পজন
মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ক্ষেত্রেও রয়েছে বড় ধরনের ঘাটতি। তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৬৯ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা বা পুনর্বাসনসেবা নিতে চান। কাউন্সেলিং সেবা নিতে আগ্রহী প্রায় ৬২ শতাংশ। কিন্তু বাস্তবে চিকিৎসা বা পুনর্বাসনের সুযোগ পেয়েছেন মাত্র ১৩ শতাংশ।
ফলে মাদকাসক্তদের শনাক্ত করার পাশাপাশি চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শুধু অভিযান নয়, বিকল্প জীবিকার সুযোগও
সংকুচাইল এলাকার বাসিন্দা ও শিক্ষক আবুল হাশেম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, শুধু অভিযান চালিয়ে সীমান্তের মাদক ও চোরাচালান বন্ধ করা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে জড়িত মানুষের আর্থিক ও সামাজিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে। কর্মসংস্থান, কারিগরি প্রশিক্ষণ, শিক্ষা, নারীদের আয়মুখী কর্মকাণ্ড এবং বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি না হলে একই পরিবার বা এলাকার মানুষ বারবার অপরাধের ঝুঁকিতে ফিরে যেতে পারে।
সীমান্তঘেঁষা মাহমুদ নামে এক প্রবাসী বলেন, এ এলাকার মানুষের কাছে মাদক সহজলভ্য। তাই মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু মাদক উদ্ধার ও গ্রেপ্তার নয়, সরবরাহব্যবস্থা বন্ধ করার পাশাপাশি তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে সামাজিক উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন।
পুলিশের নজরদারি বাড়ানোর কথা
বুড়িচং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. লুৎফুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, তারা নিয়মিত মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তার করছেন এবং সচেতনতামূলক সভা করছেন। সংকুচাইল এলাকায় পুলিশের টিম আরও গুরুত্ব দিয়ে কাজ করবে।
সার্বিক বিষয়ে কুমিল্লা-৫ আসনের এমপি জসিম উদ্দিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, মাদক বন্ধে তিনি দিন-রাত কাজ করছেন। সংকুচাইল একেবারে সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় সেখানে মাদকাসক্ত ও মাদক বিক্রেতা থাকার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন তিনি। ওই এলাকায় মাদক কারবারিদের তালিকা করে কাউন্সেলিং করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এতে কাজ না হলে তাঁদের পুলিশে সোপর্দ করার কথাও জানান তিনি। একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
‘কাউন্সিলিং করব, না ফিরলে পুলিশে ধরিয়ে দিব’
সার্বিক বিষয়ে কুমিল্লা-৫ আসনের এমপি জসিম উদ্দিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “দেখেন রাত-দিন আমি মাদক বন্ধ করার জন্য কিভাবে কাজ করছি দেশবাসী দেখছে। সংকুচাইল এলাকাটি একদম সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়াই এখানে মাদকাসক্ত ও বিক্রেতা থাকাটাই স্বাভাবিক। ওই এলাকায় মাদক কারবারিদের তালিকা করে কাউন্সিলিং করব এতেও যদি না ফিরে আমি নিজেই তাদেরকে পুলিশে ধরিয়ে দিব। আর কর্মসংস্থানের বিষয়টিও আমরা গুরুত্ব দিব।”