ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা এবং অভিন্ন নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার বিষয়ে সোচ্চার হয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের যে পাওনা, তা গত পাঁচ দশকে অর্জিত হয়নি।
বুধবার বিকেলে রাজধানীর পলাশী মোড়ে ‘আগ্রাসনবিরোধী আট স্তম্ভের’ সামনে এক স্মরণসভার মাধ্যমে এই দাবি জানান তিনি। ২০১৯ সালে ছাত্রলীগের (নিষিদ্ধ) নির্যাতনে নিহত বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের সপ্তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে ‘আবরার ফাহাদ স্মৃতি সংসদ’-এর উদ্যোগে এই আয়োজনের কথা জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে কোনো ধরনের বৈরিতা বা শত্রুতা আমাদের প্রত্যাশা নয়, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের স্বার্থ সুরক্ষা হচ্ছে কি না। আমাদের সঙ্গে ভারতের অভিন্ন অনেকগুলো নদী রয়েছে। আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুসারে এসব নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা বাংলাদেশের পাওয়ার কথা থাকলেও গত পাঁচ দশকেও বাংলাদেশ তা পায়নি।’
১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে। এই প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ভারত দাবি করে আসছে যে তারা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় এবং বাংলাদেশকে প্রতিবেশী হিসেবে দেখতে চায়। তবে এই দাবির সত্যতা প্রমাণ করতে হবে গঙ্গার পানিবণ্টনের নতুন চুক্তির মাধ্যমে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই চুক্তি কেবল নবায়ন করলেই চলবে না, বরং নতুন করে স্বাক্ষর করতে হবে। এটি কেবল পানি ভাগাভাগির বিষয় নয়, বরং নদীর যৌথ হিস্যার প্রশ্ন, যার ফলে নদী ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নাহিদের দাবি, নতুন গঙ্গা চুক্তিতে একটি ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে নদীতে সব সময় নাব্যতা বজায় রাখতে ন্যূনতম প্রবাহ নিশ্চিত করা যায় এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির ঘাটতি হলে ভারত ও বাংলাদেশ সমানভাবে তা বহন করে। বিএনপি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আবরার ফাহাদের চেতনাকে সমুন্নত করতে হলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে পুনঃস্থাপন করতে হবে। ভারত যদি প্রকৃত অর্থেই প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক চায়, তবে গঙ্গা ও তিস্তাসহ সব অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন চুক্তি সমভাবে ও ন্যায্যভাবে সম্পাদন করতে হবে।
ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের সমালোচনা করে এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, শুধু বোয়িং বিমান কিনলেই হবে না, সরকার গঙ্গার পানিচুক্তির নবায়ন বা নতুন চুক্তি কীভাবে সম্পাদন করে এবং সেখানে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটা আদায় করতে পারে, সেটি দেখার বিষয়। সরকারের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানের কথা উল্লেখ করে তিনি অভিযোগ করেন যে, বাংলাদেশ তার স্বার্থ রক্ষা করতে পারছে না। তিনি বলেন, ‘গঙ্গা চুক্তিসহ যত আন্তর্জাতিক চুক্তি হয়েছে, সেগুলো সংসদে আলোচনা করতে হবে। জনগণের স্বার্থ সুরক্ষার কথা মাথায় রেখেই আমরা সেই চুক্তির পক্ষ বা বিপক্ষ নেব।’
আবরার ফাহাদের কথা স্মরণ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, আবরার তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলেননি এবং তৎকালীন সরকারও ফ্যাসিস্ট ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তিনি কেবল ভারত ফেনী নদীকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সঙ্গে যে চুক্তি সম্পাদন করেছিল বা করতে যাচ্ছিল, তা নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন। সেই সমালোচনার কারণেই তাঁকে নির্যাতন করা হয়। নাহিদের মতে, আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকাটা ভারতীয় আগ্রাসনেরই একটি এক্সটেনশন ছিল, যা আবরার হত্যার ঘটনার মাধ্যমে সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সব আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে আবরার ফাহাদ হত্যার রায় অবিলম্বে কার্যকর করার দাবি জানান নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমরা খুনিদের ফাঁসির দণ্ড অবিলম্বে কার্যকর দেখতে চাই। বাংলাদেশ যদি সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারে, তাহলে আবরার ফাহাদের আত্মা শান্তি পাবে বলে আমরা মনে করি।’
আবরার ফাহাদ স্মৃতি সংসদের আহ্বায়ক, এনসিপির সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন এই স্মরণসভার সভাপতিত্ব করেন। সালেহউদ্দিন সিফাতের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার, আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ও মাহফুজ আলম, এনসিপির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক ইসহাক সরকার, জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক তারিকুল ইসলাম এবং জাতীয় ছাত্রশক্তির সাবেক সভাপতি জাহিদ আহসান প্রমুখ।