কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪ হাজার মানুষ ভিড় করেন। রোগী ও তাদের স্বজনদের পাশাপাশি নিয়মিত যাতায়াত করেন মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তবে হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে যাতায়াতের জন্য কুষ্টিয়া-রাজবাড়ী-ঢাকা মহাসড়ক পার হওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ নেই। অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, হাসপাতাল সংলগ্ন এই গুরুত্বপূর্ণ অংশে পথচারীদের নিরাপদ পারাপারের কোনো ব্যবস্থা নেই। এখানে নেই কোনো জেব্রা ক্রসিং, স্পিড ব্রেকার কিংবা পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড। ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষকে জীবন ঝুঁকি নিয়ে ব্যস্ত এই মহাসড়ক পার হতে হচ্ছে, যা যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি করছে।
নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একাধিকবার সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগকে চিঠি দিলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এই বিষয়ে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মো. আকুল উদ্দিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আমরা অনেকবার সড়ক বিভাগকে বলেছি। কিন্তু তারা কেন যেন অনীহা প্রকাশ করেছে। আমরা আবারও তাদের রিমাইন্ডার করব।”
জানা গেছে, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের অনেকেরই প্রয়োজনীয় ওষুধ কিনতে মহাসড়কের ওপারে যেতে হয়। ওষুধ কিনে ফেরার সময় তাদের আবারও ব্যস্ত মহাসড়ক পার হতে হয়। সামনে দিয়ে দ্রুতগতির বাস ও ট্রাক এবং দুই পাশে ছুটে চলা ভারী যানবাহনের ফাঁক গলে কখনো হেঁটে, আবার কখনো দৌড়ে রাস্তা পার হন রোগী, স্বজন ও মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা। যেন চিকিৎসা নিতে এসে প্রতিদিন জীবন হাতে নিয়ে মহাসড়ক পার হওয়ার কঠিন পরীক্ষা দিতে হচ্ছে তাদের।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪ হাজার মানুষ এখানে চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। কুষ্টিয়া ছাড়াও আশপাশের অন্তত চার জেলার মানুষ নিয়মিত চিকিৎসার জন্য এই হাসপাতালে ভিড় করেন। শুধু রোগী ও স্বজন নন, প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষকে এই ঝুঁকিপূর্ণ মহাসড়ক পার হতে হয়।
অন্যদিকে, কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজে বর্তমানে প্রায় ৫০৪ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত আছেন। পাশাপাশি কলেজে ৮২ জন শিক্ষক এবং ৮২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়মিত যাতায়াত করেন। এছাড়া কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিশেষজ্ঞসহ ৬৮ জন চিকিৎসক, ৩৯ জন নার্স এবং নিরাপত্তার জন্য ৩৬ জন আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। হাসপাতাল ও কলেজ মিলিয়ে প্রতিদিন কয়েকশ কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষার্থী এবং বিপুলসংখ্যক রোগী ও স্বজনের চলাচলের কারণে হাসপাতাল সংলগ্ন মহাসড়কটি কার্যত ব্যস্ত পথচারী পারাপারের একটি পয়েন্টে পরিণত হয়েছে। যদিও সড়কে রাম্বল স্ট্রিপ রয়েছে, তবে তা কার্যকর হচ্ছে না এবং নিরাপদ পারাপারের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের সামনের মহাসড়কের অপর পাশে বেশ কিছু ফার্মেসি ও ওষুধের দোকান গড়ে উঠেছে। ফলে রোগী ও স্বজনদের ওষুধ, খাবারসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে রাস্তার ওপারে যেতেই হয়। দেখা যায়, হাতে ওষুধের স্লিপ নিয়ে কেউ মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে গাড়ির ফাঁক খুঁজছেন, আবার কেউ যানবাহনের গতি কমার অপেক্ষা না করেই ঝুঁকি নিয়ে ছুটে পার হচ্ছেন সড়ক। ওষুধ কিনে ফেরার সময়ও একই ঝুঁকি নিতে হয়। একবার মহাসড়ক পার হয়ে হাসপাতালে ঢোকার পর প্রয়োজনীয় কিছু কিনতে আবার বের হতে হয়, ফলে একই ব্যক্তিকে দিনে একাধিকবার ব্যস্ত মহাসড়ক পার হতে হচ্ছে। অথচ হাসপাতাল এলাকায় কোনো হাসপাতাল নির্দেশক সাইন কিংবা পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড নেই।
বিশেষ করে অসুস্থ রোগী, বয়স্ক ব্যক্তি, নারী ও শিশুদের নিয়ে স্বজনদের চরম বিপাকে পড়তে হচ্ছে। দ্রুতগতির বাস, ট্রাক ও অন্যান্য ভারী যানবাহনের কারণে কয়েক মিনিটের এই সড়ক পারাপারই তাদের কাছে আতঙ্কের হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগীর স্বজন বলেন, “রোগী নিয়ে হাসপাতালে আসি। ওষুধ বা প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে রাস্তার ওপারে যেতে হয়। গাড়িগুলো অনেক দ্রুত চলে। রাস্তা পার হওয়ার সময় সব সময় ভয় লাগে। কখন কী হয়, বলা যায় না।”
রোগীর স্বজন খাদিমুল ইসলাম বলেন, “হাসপাতালে রোগী নিয়ে আসার পর ওষুধসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে আমাদের মহাসড়কের ওপারে যেতে হয়। কিন্তু এখানে গাড়িগুলো খুব দ্রুতগতিতে চলাচল করে। রোগী বা স্বজনদের রাস্তা পার হতে গিয়ে সব সময় আতঙ্কে থাকতে হয়। একটা স্পিড ব্রেকার বা নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা থাকলে আমাদের জন্য অনেক সুবিধা হতো।”
মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা জানান, প্রতিদিন তাদের এই মহাসড়ক পার হতে হয়। কোনো স্পিড ব্রেকার বা পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা না থাকায় দ্রুতগতির গাড়ি এলে রাস্তা পার হওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। কুষ্টিয়া মেডিকেলের পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থী ফাইরুজ জাবিন বলেন, “মেডিকেল শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিন ধরেই হাসপাতাল ও ক্যাম্পাসের প্রয়োজনে মহাসড়ক পারাপার করতে হচ্ছে। এটি ঢাকা-ঝিনাইদহ বা ঢাকা-কুষ্টিয়া মহাসড়ক হওয়ায় বাস, ট্রাকসহ বড় যানবাহনের কারণে পারাপারে ঝুঁকি রয়েছে। শিক্ষার্থী ছাড়াও হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের সংখ্যা বাড়ায় ঝুঁকিটা আরও বেড়েছে। তাই সবার নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে এখানে একটি ফুটওভার ব্রিজ ও সড়ক প্রশস্ত করার প্রকল্প নেওয়া প্রয়োজন।”
স্থানীয় বাসিন্দা লিমন খান বলেন, “এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আসে। হাসপাতাল সামনে থাকার কারণে সড়ক পারাপারের চাপও অনেক বেশি। একটা দুর্ঘটনা ঘটলে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।”
ফার্মেসি ব্যবসায়ী আবু সাঈদ বলেন, “রোগী ও স্বজনরা ওষুধ কিনতে এসে রাস্তা পার হওয়ার সময় সমস্যায় পড়েন। অনেক সময় গাড়ি দ্রুতগতিতে চলে আসে। এখানে স্পিড ব্রেকার বা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা থাকলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।”
শুধু রোগী ও স্বজন নন, হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী-শিক্ষক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও নিয়মিত এই ঝুঁকিপূর্ণ অংশ পার হতে হয়। মহাসড়কটিতে দূরপাল্লার বাস, ট্রাকসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন দ্রুতগতিতে চলাচল করায় পথচারীদের ঝুঁকি আরও বাড়ছে। এর আগে এই ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও বিষয়টি জানিয়ে সড়ক বিভাগের কাছে একাধিকবার চিঠি দিয়েছে বলে জানা গেছে, তবে এখনো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হাসপাতালের মতো জনবহুল একটি প্রতিষ্ঠানের সামনে যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের চলাচল, সেখানে চালকদের সতর্ক করতে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। নেই পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড কিংবা পথচারীদের জন্য নির্দিষ্ট পারাপারের ব্যবস্থা। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিষয়টি এখন আর শুধু জনদুর্ভোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এই অনিরাপদ পারাপার যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। স্থানীয়দের দাবি, দুর্ঘটনা বা প্রাণহানির পর ব্যবস্থা নেওয়ার অপেক্ষা না করে এখনই নির্দিষ্ট পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা, জেব্রা ক্রসিং, প্রয়োজনীয় স্পিড ব্রেকার এবং সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন করতে হবে। একই সঙ্গে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সচেতন নাগরিক আব্দুর রাজ্জাক বাচ্চু বলেন, “যে মানুষগুলো জীবন বাঁচাতে হাসপাতালে আসছেন, তাদেরই যদি চিকিৎসার পথে মহাসড়ক পার হতে গিয়ে জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে হয়, তাহলে এই নিরাপত্তাহীনতার দায় নেবে কে? খুব দ্রুত এই সমস্যা স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।”
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) কুষ্টিয়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. শাহারিয়া ইমন রুবেল বলেন, “কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী, স্বজন ও শিক্ষার্থী মহাসড়ক পারাপার হন। অথচ সেখানে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে স্পিড ব্রেকার কিংবা পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড নেই। এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি বিষয়। বড় কোনো দুর্ঘটনা বা প্রাণহানি ঘটার আগে হাসপাতালসংলগ্ন এলাকায় স্পিড ব্রেকার, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড ও নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা করা জরুরি। মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সড়ক বিভাগকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।”
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আনোয়ার পারভেজ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আমি একটি দরখাস্ত দেখেছি। যেখানে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিজ অর্থায়নে ফ্লাইওভার তৈরির জন্য আবেদন করেছে। আমি বিষয়টি আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাব। তারা যে নির্দেশনা দেয়, সে অনুযায়ী হবে।”
কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. শহীদুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আমাদের বিভিন্ন ফোরামে আলাপ হয়। সেখানে আমরা বলেছি। আমাদের ছাত্রছাত্রীরাও বলেছে। আমরা এখানে স্থায়ী সমাধান চাই। ফ্লাইওভার কিংবা ফুটওভার ব্রিজ হলে এটি স্থায়ী সমাধান হবে। এমপি মহোদয়কেও জানিয়েছি।”
কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলা আছে। মন্ত্রণালয়ে আমি যোগাযোগ করেছি। সড়কমন্ত্রী বলেছেন, জনগণের বাস্তবতা দেখে একটি রিপোর্ট দিয়ে ডিও লেটার দিতে। এরপর আমি সড়ক বিভাগের সঙ্গে কথা বলে কুষ্টিয়ায় যারা দায়িত্বে আছেন, তাদের জানাব।” তিনি আরও বলেন, “এখন এই জায়গায় দুটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ বলছে ফ্লাইওভার করে ওপর দিয়ে-নিচ দিয়ে মানুষ যাতায়াতের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। আবার কেউ বলছে একটি মোটা স্পিড ব্রেকার দিতে হবে।”