কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় ফেসবুকে প্রতিবাদ জানানোকে কেন্দ্র করে রোগীর স্বজনদের মারধরের অভিযোগ উঠেছে মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে। এ সময় তাদের মারধরের পাশাপাশি একটি মোটরসাইকেল ও মুঠোফোন কেড়ে নেওয়ার অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা। এ ঘটনায় গুরুতর আহত একজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তার কারণে হাসপাতালে ভর্তি এক শিশুকেও অন্যত্র নিয়ে গেছে তার পরিবার।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সন্ধ্যার পর কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে হাসপাতাল এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে কুষ্টিয়া মডেল থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
স্থানীয় বাসিন্দা, ভুক্তভোগী পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, কুষ্টিয়া শহরের হরিশংকরপুর এলাকার রহমত আলীর ছেলে সোহাগ ও সোহেল এ ঘটনার শিকার হন। সোহেলের ছেলে গত এক সপ্তাহ ধরে নিউমোনিয়া ও রক্তের সংক্রমণজনিত সমস্যায় কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, শনিবার সন্ধ্যায় সোহেল হাসপাতালে প্রবেশের পর ২৫ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থী তাকে মারধর করেন। এ সময় ছোট ভাই সোহাগ তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে শিক্ষার্থীরা তার দিকেও লাঠিসোঁটা নিয়ে তেড়ে যান। সোহাগ দৌড়ে হাসপাতাল চত্বরের বাইরে চলে যান। পরে বাইরে ডাব বিক্রির একটি দোকান থেকে হাসুয়া নিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। তবে অভিযোগ অনুযায়ী, শিক্ষার্থীরা হাসপাতাল চত্বরের বাইরে বের হননি।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, এ সময় সোহাগের মুঠোফোন ও মোটরসাইকেল নিয়ে নেওয়া হয়। পুলিশের হস্তক্ষেপে মুঠোফোনটি উদ্ধার হলেও মোটরসাইকেলটি পাওয়া যায়নি। ঘটনার পর নিরাপত্তার কারণে সোহেলের ছেলেকে হাসপাতাল থেকে অন্যত্র নিয়ে যায় পরিবার। আর গুরুতর আহত সোহেলকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাত ১১টার দিকে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হৃদ্রোগে আক্রান্ত এক রোগীর মৃত্যু হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে চিকিৎসক ও স্বজনদের মধ্যে হাতাহাতি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে মৃত রোগীর ছেলেসহ তিনজনকে আটকে রেখে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা। পুলিশ তাদের আদালতে পাঠায়।
ওই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন সোহাগ ও সোহেল। পরিবারের অভিযোগ, সেই পোস্টের জের ধরে শনিবার সন্ধ্যায় হাসপাতালে প্রবেশের পর তাঁদের ‘দালাল’ আখ্যা দিয়ে দলবদ্ধভাবে মারধর করা হয়। এ ঘটনার পর আহত সোহাগ জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশের সহায়তা চান।
সোহাগের স্ত্রী মারিয়া মুক্তকণ্ঠকে বলেন, এর আগে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক রোগীর মৃত্যু হয়েছিল। ওই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন আমার স্বামী ও ভাসুর।
তিনি বলেন, তাঁর ভাসুরের ছেলে ছয় দিন ধরে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। শনিবার সন্ধ্যায় তার ভাসুর সোহেল হাসপাতালে প্রবেশের পর জরুরি বিভাগের গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ সময় কয়েকজন শিক্ষার্থী তাদের উদ্দেশে বলতে থাকেন, ‘আজ রোগী মারা যায়, রোগী মারা যাবে, তুই পোস্ট করলি কেন, এসব পোস্ট করলি কেন?’ এরপরই তারা মারধর শুরু করেন বলে অভিযোগ করেন মারিয়া।
মারিয়ার দাবি, মারধরে তার ভাসুর গুরুতর আহত হয়েছেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে রাজশাহীতে নেওয়া হচ্ছে। এ সময় তার স্বামীর মুঠোফোন ও মোটরসাইকেল নিয়ে নেওয়া হয়। পরে মুঠোফোনটি ফেরত পেলেও মোটরসাইকেলটি এখনো পাওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য চম্পা খাতুন বলেন, আমার নাতি হাসপাতালে ভর্তি। আমার মেজো ছেলে সোহেল হাসপাতালে ঢোকার পর মেডিকেলের শিক্ষার্থীরা ‘এইডা এইডা ধর’ বলে তার সঙ্গে কথা-কাটাকাটি ও গণ্ডগোল শুরু করে। তারা আমার এক ছেলেকে মারতে শুরু করে। অন্য ছেলেকেও মারতে যায়। সে দৌড়ে পালিয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, পরে লোকজনের কাছে শুনেছেন, কয়েকজন মিলে তার ছেলেকে মারধর করেছেন। মারধরের সময় মোটরসাইকেলের চাবি কেড়ে নেওয়া হয়। তার ছেলে একপর্যায়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন তিনি।
মারধরের শিকার সোহাগ বলেন, ঘটনাস্থলে একজন পুলিশ সদস্য ছিলেন। তিনি আমাকে শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেন। সে সময় আমার ছোট ভাই সোহাগ দৌড়ে না পালালে ওকে পিটিয়ে মেরে ফেলত। এর আগে এক রোগী মারা যাওয়ার ঘটনায় প্রতিবাদ করেছিলাম। সে কারণেই আমাকে মারধর করা হয়েছে। এখানে আমি চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছি। এখানে চরম গ্রুপিং চলে।
স্থানীয় বাসিন্দা টিটু মুক্তকণ্ঠকে বলেন, মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক আচরণ এবং রোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের নানা অভিযোগ রয়েছে। তুচ্ছ বিষয় নিয়েও অনেক সময় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। চিকিৎসা নিতে এসে রোগী ও তাদের স্বজনেরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগলে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
আন্তর্জাতিক আইন সহায়তা কেন্দ্রের (আসক) কুষ্টিয়া জেলা সভাপতি তানভীর আহমেদ রয়েল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, মেডিকেল কলেজটি চালুর শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের একাংশের মধ্যে আক্রমণাত্মক আচরণ দেখা যাচ্ছে বলে তার অভিযোগ। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রোগী ও তাদের স্বজনদের বিরোধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাও ঘটছে।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের আচরণের কারণে রোগী ও তাদের স্বজনেরা অনেক সময় অবহেলিত বোধ করেন। এ বিষয়ে কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জনকে আগেও অবহিত করা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। তবে তাতে কোনো সুফল পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ তার।
এ বিষয়ে মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কয়েক দফা যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কুষ্টিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাকির হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, শিক্ষার্থীদের বক্তব্য অনুযায়ী, ভুক্তভোগীদের ‘দালাল’ বলা হয়েছিল। তিনি বলেন, আমি যতটুকু পেরেছি, ভুক্তভোগী পরিবারকে সহযোগিতা করেছি। তারা পরবর্তী সময়ে অভিযোগ দিলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. শহীদুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, অনেকগুলো ঘটনার রেশ বলে মনে হচ্ছে। আগে থেকেই ঝামেলা ছিল। আজ একজন চোর ধরা পড়েছিল। চোরকে বাইরে ছেলেরা মারধর করলে মেডিকেলের শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করেন। সেখান থেকেই গণ্ডগোলের সৃষ্টি হয়।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে মেডিকেল ক্যাম্পাস পুলিশ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।