অন্যান্য ফলের তুলনায় মাল্টা চাষে ঝুঁকি কম এবং এটি অধিক লাভজনক ও সুবিধাজনক। এই বিশেষ সম্ভাবনার কারণে বর্তমানে পিরোজপুর জেলার অনেক কৃষক মাল্টা চাষের দিকে ঝুঁকছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম সফল একজন হলেন পিরোজপুর সদর উপজেলার কদমতলা ইউনিয়নের পোরগোল্লা গ্রামের বাসিন্দা নাসির হাওলাদার। তিনি নিজের গ্রামেই বিশাল এক জমিতে সমন্বিত মাল্টা বাগান গড়ে তুলেছেন এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আশানুরূপ সাফল্য অর্জন করেছেন। জেলা কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, পিরোজপুরের মাটি ও আবহাওয়া মাল্টা চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
নাসির হাওলাদারের কৃষি জীবনের যাত্রা শুরু হয় ২০০৯ সালে বাওকুল চাষের মাধ্যমে। বাওকুল চাষে অভাবনীয় সাফল্য পাওয়ার পর তিনি মাল্টা চাষের প্রতি আগ্রহী হন। চার-পাঁচ বছর বাওকুল চাষ করার পর তিনি ‘বারি মাল্টা-১’ (পয়সা মাল্টা) জাতের আবাদ শুরু করেন। শুরুতে মাত্র ১ বিঘা জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করে সফল হওয়ার পর বর্তমানে তার মাল্টা বাগান প্রায় ১৫ থেকে ১৬ বিঘা জমিতে বিস্তৃত হয়েছে। এই বিশাল বাগানের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বর্তমানে ৮ থেকে ১০ জন শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছেন। দীর্ঘ ১২ বছর ধরে তিনি মাল্টা চাষের সাথে যুক্ত। এবার তিনি নতুন করে স্ট্রবেরি চাষের উদ্যোগ নিয়েছেন এবং আগামী মৌসুমেই এর আবাদ শুরু করার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন।
৪৪ বছর বয়সী নাসির হাওলাদার দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে কৃষি পেশার সাথে জড়িত। ১৯৯৯ সালে মাধ্যমিক পাস করার পর তিনি একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি শুরু করেছিলেন। তবে গণমাধ্যমে এক কৃষকের বাওকুল চাষে সফলতার কাহিনী পড়ে তিনি অনুপ্রাণিত হন এবং চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিজস্ব জমিতে বাওকুল চাষ শুরু করেন। বর্তমানে তার সেই বাওকুল বাগানটিও সক্রিয় রয়েছে। পুরো প্রকল্পটির নাম দিয়েছেন তিনি ‘হাওলাদার কৃষি খামার’। মাল্টা ও বাওকুল ছাড়াও প্রায় ৩ বিঘা জমিতে পেঁপে চাষ এবং বিভিন্ন জাতের শাক-সবজি আবাদ করেছেন তিনি। সব মিলিয়ে প্রায় ২০ বিঘা জমিতে তার এই সমন্বিত কৃষি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
নাসিরের বাগানে কর্মরত শ্রমিকরাও তাদের জীবনযাপন নিয়ে সন্তুষ্ট। ব্রাহ্মণকাঠী গ্রামের বাসিন্দা শ্রমিক সুজন মীর বলেন, “আমি প্রায় ৫ বছর ধরে এই বাগানে কাজ করছি। গাছের গোড়ায় সার দেওয়া, কীটনাশক প্রয়োগ ও পরিচর্যা করি। ফল পরিপক্ব হলে সংগ্রহ করি। মালিক আমাকে মাসে ১৮ হাজার টাকা বেতন, দুপুরের খাবার ও চিকিৎসার খরচ দেন। এই উপার্জনে পরিবার নিয়ে ভালোভাবে চলতে পারছি।”
আরেক শ্রমিক শাহাদাত খলিফা জানান, “আমরা এখন গাছ থেকে মাল্টা তুলছি। ফল তোলা শেষ হতে প্রায় দুই মাস লাগবে। এরপর গাছের গোড়া পরিষ্কার করে মাটি কুপিয়ে সার ও কীটনাশক দিতে হবে, যাতে আগামী মৌসুমে আবার ভালো ফলন আসে। এখানে কাজ করে প্রতিদিন ৬০০ টাকা করে মজুরি পাই। গত ৪-৫ বছর ধরে এই বাগানে কাজ করছি। মালিকের কুল ও সবজি বাগানও রয়েছে।”
বিগত ৭ বছর ধরে কর্মরত শ্রমিক আব্দুল লতিফ বলেন, “বাগানে চারা রোপণ থেকে শুরু করে পরিচর্যা ও ফল সংগ্রহ পর্যন্ত সব কাজ করি। মালিক এখান থেকেই পাইকারদের কাছে মাল্টা বিক্রি করেন। কাজ করে আমরা পরিবার নিয়ে শান্তিতে আছি।”
নাসির হাওলাদারের এই অভাবনীয় সফলতা স্থানীয়দের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা মো. নাদিম শেখ জানান, “আমার চাচা নাসির হাওলাদার কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে অল্প জমিতে মাল্টা চাষ শুরু করে আশানুরূপ ফল পান। পরে তিনি বাগানের পরিধি বাড়ান। তাকে দেখে আমাদের এলাকার অনেকেই এখন সফলভাবে মাল্টা চাষ করছেন। আমাদের এলাকায় প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষই কৃষির ওপর নির্ভরশীল।”
নিজের সফলতার অনুভূতি ব্যক্ত করে চাষি নাসির হাওলাদার বলেন, “বাওকুল চাষ দিয়ে শুরু করলেও আমাদের এলাকায় মাল্টা চাষের সম্ভাবনা দেখে ১ বিঘা জমিতে আবাদ শুরু করি। আল্লাহর রহমতে সফল হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে বাগানের পরিধি বাড়িয়েছি এবং অন্যান্য ফল-সবজি যোগ করেছি। আমাকে দেখে এলাকায় ব্যাপক চাষ ছড়িয়ে পড়েছে। এ বছর নতুন করে স্ট্রবেরি চাষ শুরু করব।”
তিনি আরও জানান, চলতি মৌসুমে প্রায় ২০ লাখ টাকার মাল্টা বিক্রির আশা করছেন তিনি। গত বছর তিনি প্রায় ১৬ লাখ টাকার মাল্টা বিক্রি করেছিলেন। তবে এ বছর অতিরিক্ত বর্ষণের কারণে কিছু ফল ঝরে যাওয়ায় কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। পিরোজপুরের এই সুস্বাদু মাল্টা ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়।
তবে সার ও কীটনাশকের ভেজালের বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নাসির। তিনি সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, “সারের পর্যাপ্ত ভর্তুকির পাশাপাশি বাজারে সঠিক নজরদারি প্রয়োজন। আমরা যেন ভেজাল সার ও ওষুধ কিনে প্রতারিত না হই।” আক্ষেপ করে ছন্দের সুরে তিনি আরও বলেন, “সার কিনিতে ঊষার গিনি, ভেজাল সারে ভরা / প্রতারণার শিকার হই আমরা দিশেহারা।”
পিরোজপুর জেলায় মাল্টা চাষের সার্বিক অগ্রগতির বিষয়ে পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৌমিত্র সরকার জানান, পিরোজপুরে গত বছর ৪৩০ হেক্টর জমিতে মাল্টা চাষ হলেও এ বছর তা বেড়ে ৪৩৬ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। গত বছর মোট উৎপাদন ছিল ৬ হাজার ১০৩ টন, যা চলতি মৌসুমে বেড়ে ৬ হাজার ২৪৩ টনে পৌঁছেছে। পিরোজপুর সদর, নাজিরপুর, কাউখালী ও জিয়ানগরসহ জেলার প্রতিটি উপজেলাতেই এখন মাল্টা উৎপাদিত হচ্ছে।
কৃষি কর্মকর্তা আরও জানান, পিরোজপুরের মাল্টা অত্যন্ত সুস্বাদু। বারি মাল্টা-১ সংগ্রহের জন্য বিশেষ ক্রপ ক্যালেন্ডার নির্ধারণ করা হয়েছে; প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে এই মাল্টা সংগ্রহ বা হারভেস্ট করতে হয়। জেলাজুড়ে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কৃষক এই চাষের সাথে যুক্ত এবং প্রতি বছর এই জেলা থেকে প্রায় ১৮ থেকে ২০ কোটি টাকার মাল্টা বিক্রি হয়।