জন্মগতভাবে দুই পা অচল এবং খর্বকায় শরীর, হাঁটুর ওপর ভর করেই চলাফেরা করতে হয় তাঁকে। তবে শারীরিক এই সীমাবদ্ধতা কামাল হোসেনের জীবনযুদ্ধের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। মাত্র ১২ বছর বয়স থেকেই শুরু করেছেন গাছের ডালপালা ছাঁটাইয়ের কাজ। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এই পেশার ওপর ভর করেই টিকে আছে তাঁর সাত সদস্যের সংসার।

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর মসূয়া ইউনিয়নের খানবাড়ির বাসিন্দা কামাল হোসেনের বর্তমান বয়স ৪২ বছর। তাঁর বাবা হেকিম খান বার্ধক্যের কারণে চলাফেরা করতে অক্ষম এবং তিনি হৃদ্‌রোগ ও শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। পাঁচ বছর আগে তাঁর মা নূরজাহান বেগম মৃত্যুবরণ করেছেন।

শৈশব থেকেই অভাবের সাথে পরিচিত ছিলেন কামাল। তাঁর বাবা অন্যের জমি বর্গা নিয়ে কৃষিকাজ করতেন, কিন্তু তিন বেলা খাবার জোগাড় করাও ছিল তাঁদের জন্য কঠিন। চার সন্তানের মধ্যে কামাল একমাত্র ছেলে এবং সবার ছোট।

কামাল জানান, ১২ বছর বয়সে যখন তিনি সংসারের জন্য কিছু করার কথা ভাবলেন, তখন দেখলেন গ্রামের সাধারণ কাজগুলো হলো মাটি কাটা বা ভারী বোঝা বহন করা। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে এই কাজগুলো তাঁর পক্ষে করা সম্ভব ছিল না। তখন নিজেকে পরিবারের কাছে বোঝা মনে হতে শুরু করে তাঁর। তবে ছোটবেলায় তিনি খুব সহজেই উঁচু গাছে উঠতে পারতেন এবং মগডাল থেকে ফল পেড়ে আনতে পারতেন। একদিন তাঁর মাথায় এল যে, গ্রামের মানুষ প্রতিবছর গাছ ছাঁটাই করান এবং এই কাজ করে আয় করা সম্ভব। সেই ভাবনা থেকেই তিনি পেশাদারভাবে গাছ ছাঁটাই শুরু করেন।

শুরুতে নিজের গ্রামের কাজ করলেও পরে তিনি পাশের আলগীর চর ও বৈরাগীর চর গ্রামে যেতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে এবং পাকুন্দিয়া উপজেলার বুরুদিয়া, সালুয়াদি ও আহুতিয়া গ্রাম থেকেও ডাক আসতে থাকে। শুরুর দিকে একটি বিশেষভাবে তৈরি হস্তচালিত রিকশা, ৪০ গজ লম্বা মোটা দড়ি এবং একটি দা নিয়ে কাজ করতেন তিনি। বর্তমানে এক প্রবাসীর দেওয়া ব্যাটারিচালিত ভ্যানে করে তিনি যাতায়াত করেন।

কামাল হোসেন বলেন, “বড় একটি গাছ ছাঁটাই করতে প্রায় দুই ঘণ্টা লাগে। ছোট গাছে লাগে প্রায় এক ঘণ্টা। বড় গাছ ছাঁটাই করে পান প্রায় ৫০০ টাকা। ছোট গাছে ৩০০ টাকা। একসময় দিনে পাঁচটি পর্যন্ত গাছ ছাঁটাই করতে পারতেন। বয়স বাড়ায় এখন সর্বোচ্চ দুটি গাছ করতে পারেন।”

তবে এই পেশায় প্রতিদিন কাজ পাওয়া যায় না। বৃষ্টির দিনে গাছ পিচ্ছিল হয়ে যাওয়ায় কাজ বন্ধ রাখতে হয়। শীতকালে কাজের চাপ বেশি থাকে, তখন মাসে প্রায় ১৫ হাজার টাকা আয় হয়। কিন্তু বর্ষায় এই আয় কমে তিন-চার হাজার টাকায় নেমে আসে। এই সীমিত আয়ের মধ্যেই টেনেটুনে চলে তাঁর সংসার।

শুরুর দিনগুলোর কথা মনে করে কামাল হোসেন জানান, তাঁর এই দুঃসাহসিক কাজে গ্রামের মানুষ ভয় পেতেন। অনেকে বলতেন, দুই পা এমনিতেই অচল, গাছ থেকে পড়ে গেলে পুরো শরীরই অচল হয়ে যেতে পারে। কিন্তু কামাল দমে যাননি। তাঁর যুক্তি ছিল, কাজ ছেড়ে দিলে তাঁকে ভিক্ষা করতে হবে, যা তিনি কখনোই চাননি। নিজের সামর্থ্য দিয়ে বাঁচতে চেয়েছেন তিনি। কামাল বলেন, “দুই পা কেন, দুই হাত অচল হলেও আমি কাজ করে খাওয়ার চেষ্টা করুম।”

কামালের স্ত্রী পারভিন আক্তার এবং তাঁদের চার সন্তান রয়েছে। বড় মেয়ে ময়না বেগমের বিয়ে হয়ে গেছে। বড় ছেলে সংগ্রাম প্রবাসে থাকলেও তাঁর অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। ছোট মেয়ে সাথী ষষ্ঠ শ্রেণিতে এবং ছোট ছেলে তাফসির দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। বৃদ্ধ বাবার চিকিৎসা, সন্তানদের পড়াশোনা এবং দৈনন্দিন খরচ মেলাতে প্রতিনিয়ত হিসাব কষতে হয় কামালকে।

গত সোমবার সকালে দেখা যায়, ১৮ ফুট লম্বা ও ১২ ফুট চওড়া একটি জরাজীর্ণ টিনশেড ঘরে থাকেন কামাল। ঘরের সামনে একটি ছাগলের পরিচর্যা করছিলেন তিনি। টিনের বেড়া দিয়ে বিভক্ত দুটি কক্ষের একটিতে থাকেন অসুস্থ বাবা এবং অন্যটিতে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে থাকেন কামাল। বৃষ্টির দিনে ঘরে পানি ঢোকার সমস্যা রয়েছে। স্ত্রী পারভিন আক্তার বলেন, “বৃষ্টি এলে তাঁদের অনেক কষ্ট হয়। স্বামীর আয় ওঠানামা করায় সংসার চালানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়।”

বাড়ির পাশে লাঠি হাতে বসে থাকা বৃদ্ধ হেকিম খান স্পষ্ট করে কথা বলতে না পারলেও কামালের দিকে তাকিয়ে বলেন, “একসময় ভাবতাম, ছেলেকে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াতে হবে। তাঁকে দিয়ে কিছু হবে না; কিন্তু সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করেছে কামাল। এখন তাঁর আয়ের ওপরই সংসার দাঁড়িয়ে আছে।”

স্থানীয় বাসিন্দা সন্দু মিয়া এবং মোড়লবাড়ি গ্রামের মুদিদোকানি আবু বক্করের মতে, কামালের এই লড়াই অন্যদের সাহস জোগাচ্ছে। তাঁদের মতে, কামাল প্রমাণ করেছেন যে প্রতিবন্ধী হয়ে জন্ম নিলেই জীবন থেমে যায় না।

দীর্ঘ এই কর্মজীবনে একবারও গাছ থেকে পড়ে দুর্ঘটনার শিকার হননি কামাল। তবে এখন বয়স বাড়ায় আগের মতো গাছে ওঠা তাঁর জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই তিনি বিকল্প আয়ের কথা ভাবছেন। পরিবারের সদস্যরাও এখন তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত। কামালের ইচ্ছা, ছোট একটি দোকান দেওয়া বা এমন কোনো কাজ করা যেখানে বসে বসে আয় করা সম্ভব হবে।

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আবুল খায়ের বলেন, “কামাল সব ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য আশার উদাহরণ। তাঁকে প্রতিবন্ধী ভাতা দেওয়া হচ্ছে। তাঁকে ঋণ দিয়ে সহযোগিতা করার কথাও ভাবা হচ্ছে।”