কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলায় ছুরিকাঘাতে আহত শাহরিয়ার জামানের ঘটনায় থানায় মামলা গ্রহণ না করার অভিযোগ তুলেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান। তিনি সাবেক সংসদ সদস্য এবং সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিয়েছেন। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে কটিয়াদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামকে অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন তিনি। আখতারুজ্জামান ঘোষণা করেছেন যে, আগামী রোববারের মধ্যে ওসিকে প্রত্যাহার করা না হলে তিনি আন্দোলনে যাবেন।

অন্যদিকে, ওসি রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন যে, মামলা গ্রহণে তাঁর কোনো আপত্তি নেই। তবে লিখিত অভিযোগের মধ্যে এমন কিছু ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যারা ঘটনার সঙ্গে যুক্ত নন, আর সেই কারণেই তিনি আপত্তি জানিয়েছেন।

আহত শাহরিয়ার জামান (৫০) হলেন মেজর আখতারুজ্জামানের বড় ছেলে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কটিয়াদী উপজেলা সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল হক রাশেদী নিশ্চিত করেছেন যে, শাহরিয়ার তাঁদের দলের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত।

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও সূত্রগুলোর বিবরণ অনুযায়ী, গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় আখতারুজ্জামানের প্রতিষ্ঠিত গচিহাটা কলেজ মাঠে কয়েকজন যুবক আড্ডা দিচ্ছিলেন। মাদক সেবনের সন্দেহে শাহরিয়ার তাঁদের গালমন্দ করেন এবং একপর্যায়ে আফতাব উদ্দিন নামের এক কিশোরকে চড় মারেন। আফতাব বাড়িতে গিয়ে তাঁর চাচা তাজুল ইসলামকে বিষয়টি জানালে তাজুল ক্ষুব্ধ হন। এরপর তিনি কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে গচিহাটা বাজারে গিয়ে শাহরিয়ারকে মারধর করেন এবং ছুরিকাঘাত করেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রায় ১২ মিনিটের একটি ভিডিও বার্তায় আখতারুজ্জামান বলেন, “ঘটনার পর রাত সাড়ে ১২টার দিকে ১২ জনের নাম উল্লেখ করে তিনি থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। এরপর ওসি অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কয়েকজনের সঙ্গে দেখা করে ফিরে এসে অবস্থান পরিবর্তন করেন। পরে আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলে ওসি মামলা নেওয়ার আশ্বাস দেন। সেই আশ্বাসে আদালতে যাওয়া থেকে বিরত থাকলেও ওসি কথা রাখেননি।”

আখতারুজ্জামানের অভিযোগ, অভিযোগপত্রে উল্লিখিত ১২ জনের মধ্যে ৫ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থেকে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এবং তাঁদের সঙ্গে ওসির যোগাযোগ রয়েছে। তিনি দাবি করেন, তাঁদের স্বার্থ রক্ষার জন্যই অভিযোগটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হচ্ছে না। এমনকি ওসি নিজেও এলাকার মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ করেন তিনি, যদিও এই দাবির সপক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি আখতারুজ্জামান।

মামলা প্রসঙ্গে ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, “এজাহারে এমন কয়েকজনের নাম দেওয়া হয়েছে, যাঁদের কোনোভাবেই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকার সুযোগ নেই। বিশেষ কারণে তাঁদের নাম দেওয়া হয়েছে বলে তাঁর ধারণা। তাঁর আপত্তি শুধু ওই কয়েকজনের নাম নিয়ে, মামলা গ্রহণে কোনো আপত্তি নেই।” তিনি আরও জানান, ইতিমধ্যে লিমন মিয়া নামের একজনকে আটক করা হয়েছে, যিনি গচিহাটা গ্রামের শামসুউদ্দিন মিয়ার ছেলে।

মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সখ্যতা ও অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করে ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, তিনি কটিয়াদীতে মাদকের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি অনুসরণ করছেন। প্রতি রাতে মাদকবিরোধী অভিযান চলছে বলে তিনি দাবি করেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেন।

উল্লেখ্য, কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন আখতারুজ্জামান। ২০২৪ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি পরাজিত হন এবং গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন।

গতকাল বুধবার রাতে দেওয়া এক বক্তব্যে আখতারুজ্জামান এই হামলার জন্য সহশ্রাম ধুলদিয়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি ও যুবদলের নেতা-কর্মীদের দায়ী করেছিলেন। তবে আজ তিনি তাঁর বক্তব্য সংশোধন করে বলেন, অভিযোগে নাম দেওয়া ১২ জনের কেউ বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন, যদিও বিএনপির কেউ কেউ পরোক্ষভাবে জড়িত থাকতে পারেন।

ছুরিকাঘাতে আহত শাহরিয়ারকে দ্রুত কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সৈয়দ মো. শাহরিয়ার জানান, শাহরিয়ারের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাত রয়েছে। পরবর্তীতে রাতেই তাঁকে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কটিয়াদী উপজেলা সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল হক রাশেদী বলেন, শাহরিয়ার তাঁদের দলের রাজনীতিতে সক্রিয়। ঘটনার সঙ্গে রাজনীতির সংশ্লিষ্টতা কতটুকু, তা তাঁরা খতিয়ে দেখছেন। তিনি হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।

অন্যদিকে, কটিয়াদী উপজেলা বিএনপির সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন খান দাবি করেন, এই ঘটনায় বিএনপির কেউ জড়িত নন। তিনি বলেন, দলের কেউ জড়িত থাকলেও তাঁকে ছাড় দেওয়া হবে না। তবে দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য দিয়ে রাজনীতির পরিবেশ উত্তপ্ত না করার অনুরোধ জানান তিনি।