সংসারের দৈনন্দিন খরচ, পেশাগত জীবন, সন্তানের ভবিষ্যৎ কিংবা সম্পর্কের টানাপোড়েন—মানুষের জীবনে চিন্তার কারণ থাকে অগণিত। নানা দায়িত্ব পালনের চাপে আমরা প্রায়ই দুশ্চিন্তার জালে জড়িয়ে পড়ি। তবে যখন কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে বারবার চিন্তা করা শুরু হয় এবং সেই চিন্তার বৃত্ত থেকে বের হওয়া সম্ভব হয় না, তখন তা ‘অতিরিক্ত চিন্তার অভ্যাসে’ পরিণত হয়। একটি ভাবনা থেকে অন্য ভাবনা এবং পুনরায় পুরোনো স্মৃতিতে ফিরে যাওয়ার এই অন্তহীন চক্র মানসিক প্রশান্তি নষ্ট করে।
দিনের ব্যস্ততার মাঝে এই চিন্তাগুলো হয়তো কিছুটা চাপা থাকে, কিন্তু রাতের নির্জনতায় বিছানায় যাওয়ার পর এগুলো আরও প্রকট হয়ে ওঠে। এর ফলে অনেকেরই ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে এবং মন শান্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পেতে এবং অতিরিক্ত চিন্তার অভ্যাস দূর করতে কার্যকর হতে পারে ‘৬:৩০ নিয়ম’। এই কৌশলের মূল কথা হলো, সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার পর দুশ্চিন্তা না করার জন্য নিজের মনে একটি নির্দিষ্ট সীমারেখা তৈরি করা।
কানাডার মনোরোগ চিকিৎসক ভিক্টোরিয়া ডোনাহুর মতে, অনেক সময় আমরা মনে করি কোনো বিষয় নিয়ে বারবার ভাবলে হয়তো সমস্যার সমাধান বেরিয়ে আসবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, আমরা কেবল একই চিন্তার বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছি, কোনো কার্যকর সমাধান পাচ্ছি না। ‘৬: ৩০ নিয়ম’ মূলত ‘ওয়ারি শিডিউলিং’ বা দুশ্চিন্তার সময়সূচী নির্ধারণ করার একটি পদ্ধতি। এটি কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপির (সিবিটি) নীতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যেখানে নেতিবাচক চিন্তা ও আচরণের ধরন পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েশিভা ইউনিভার্সিটির ফারকফ গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব সাইকোলজির সহযোগী অধ্যাপক এবং ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট এলি ক্রেইম বলেন, “দুশ্চিন্তা পুরোপুরি দূর করার চেষ্টা না করে দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় ও জায়গা এর জন্য বরাদ্দ করাই এই কৌশলের উদ্দেশ্য। এতে ধীরে ধীরে মস্তিষ্ক শিখতে পারে, প্রতিটি উদ্বেগের চিন্তার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।”
এই নিয়মের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি বাস্তব সমস্যা সমাধান এবং একই বিষয় নিয়ে অহেতুক চিন্তা করার মধ্যে পার্থক্য করতে সাহায্য করে। সন্ধ্যার পর যদি কোনো দুশ্চিন্তা মাথায় আসে, তবে নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে, “এ বিষয়ে আজ রাতে আমি আসলে কিছু করতে পারি কি?”
যদি সেই মুহূর্তে করার মতো কিছু থাকে, তবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। আর যদি করার কিছু না থাকে, তবে নিজেকে মনে করিয়ে দিতে হবে যে, এখন এই বিষয়ে ভেবে কোনো লাভ হবে না এবং সমস্যার সমাধান হবে না।
উদাহরণস্বরূপ, অফিস থেকে ফেরার পর মনে পড়ল যে পরদিন একজন সহকর্মীকে ফোন করতে হবে। এখন সারারাত “ফোনটা যদি করতে ভুলে যাই”—এই দুশ্চিন্তায় না ভুগে ফোন করার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় ঠিক করে রাখা যায়। যেমন, নিজেকে বলা যেতে পারে, “আগামীকাল সকাল ৮টায় ফোনটা করব।” এতে মস্তিষ্ক আশ্বস্ত হয় যে বিষয়টি উপেক্ষা করা হচ্ছে না। একইভাবে প্রিয়জনের সঙ্গে মনোমালিন্য হলেও রাতে তা নিয়ে না ভেবে পরদিন শান্তভাবে কথা বলার সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। নিজেকে বলা যেতে পারে, “এটা নিয়ে এখন আর কিছু ভাবব না, কাল কথা বলব।”
এলি ক্রেইমের মতে, ঘুমের আগের এক ঘণ্টা যদি মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তায় কাটে, তবে মস্তিষ্কের জন্য ‘ঘুমের মোডে’ যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাই ঘুমের আগে আবেগগত উত্তেজনা কমিয়ে রাখা প্রয়োজন। যারা রাত ১০টায় ঘুমান, তারা সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা বা ৭টার পর থেকে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা নিয়ে চিন্তা না করার অভ্যাস করতে পারেন। তবে যারা নাইট শিফটে কাজ করেন, তারা তাদের ঘুমের সময় অনুযায়ী এই সময়সীমা নির্ধারণ করে নিতে পারেন।
নির্ধারিত সময়ে দুশ্চিন্তা বন্ধ রাখা অনেকের জন্য কঠিন হতে পারে। তাই সেই সময়টুকু অন্য কোনো আনন্দদায়ক কাজে ব্যয় করা উচিত। প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানো বা নতুন কোনো শখের কাজ করা যেতে পারে। ভিক্টোরিয়া ডোনাহু বলেন, “৬: ৩০ নিয়ম আমাদের সন্ধ্যার সময়টা ফিরিয়ে দেয়। ফলে আমরা সম্পর্কের প্রতি আরও মনোযোগী হতে পারি। একই সঙ্গে যোগাযোগ ও আনন্দের জন্যও সময় বের করার সুযোগ তৈরি হয়।”
যদি সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার পর কোনো চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খেতে শুরু করে, তবে তা সামলানোর জন্য ক্রেইম পুনরায় নিজেকে প্রশ্ন করার পরামর্শ দেন, “এ বিষয়ে আজ রাতে আসলে কিছু করার আছে কি?” যদি থাকে, তবে পদক্ষেপ নিন; আর না থাকলে মনে রাখুন যে বারবার ভাবলেও সমাধান আসবে না।
তবে অতিরিক্ত চিন্তা যদি অভ্যাসে পরিণত হয় এবং তা নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, তবে তা অবহেলা করা উচিত নয়। যদি এই সমস্যা ঘুম, কাজ বা দৈনন্দিন স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলে, তবে দ্রুত একজন চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
সূত্র: রিয়্যাল সিম্পল