ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের চরম অনিয়ম, গাফিলতি ও উদাসীনতার কারণে নিরাপদ স্যানিটেশন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বরগুনার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। জেলার মোট ৪৩৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিরাপদ পানি, উন্নত স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে হাত-মুখ ধোয়ার স্থান ও শৌচাগার (ওয়াশ ব্লক) নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বছরের পর বছর অতিবাহিত হওয়ার পরেও অনেক বিদ্যালয়ে কাজ শেষ হয়নি।
তদন্তে দেখা গেছে, অনেক জায়গায় নির্মাণকাজ অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। আবার যেসব বিদ্যালয়ে কাজ শেষ হয়েছে, সেখানে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেগুলো ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ স্যানিটেশন নিশ্চিত করতে চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি-৪-এর আওতায় ২০১৮ সালে জেলার ৪৩৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ওয়াশ ব্লক নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করে সরকার। এই প্রকল্পের কাজ ২০২৩ সালের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে তা সম্পন্ন হয়নি। ঠিকাদারদের আবেদনের প্রেক্ষিতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর দফায় দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে দেয়। সর্বশেষ চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানো হলেও অনেক বিদ্যালয়ে এখনো কাজ শেষ হয়নি বলে জানা গেছে।
বরগুনার বেতাগী উপজেলার দক্ষিণ ছোপখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভবনের সাথে প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি ওয়াশ ব্লক নির্মাণের টেন্ডার দেওয়া হয়েছিল। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসিসি ও হান্নান জেভি বিদ্যালয়ের মূল ভবনের কাজ শেষ করে হস্তান্তর করলেও ওয়াশ ব্লকের কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই চলে যায়। গত তিন বছরে তিনজন সাব-ঠিকাদার এই ওয়াশ ব্লকের কাজ শুরু করলেও কেউই তা শেষ করতে পারেননি।
বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক কহিনুর বেগম বলেন, “ওয়াশ ব্লকের কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় শিক্ষার্থীরা নিরাপদ স্যানিটেশন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।”
কেবল দক্ষিণ ছোপখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নয়, বেতাগী উপজেলার ছোপখালী ধনমানিক চত্রা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ছোপখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও ওয়াশ ব্লক নির্মাণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
ছোপখালী ধনমানিক চত্রা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাসুদুজ্জামান মাসুদ বলেন, “বিদ্যালয়ে নির্মাণকাজ শেষ না করেই ঠিকাদার কাজ ফেলে চলে গেছে। নির্মাণাধীন অবস্থায় পড়ে থাকা ওয়াশ ব্লকই ঝুঁকি নিয়ে ব্যবহার করছেন শিক্ষার্থীরা।”
অন্যদিকে, জেলার যেসব বিদ্যালয়ে ওয়াশ ব্লক নির্মাণ শেষ হয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোই এখন ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। বরগুনা সদরের গিলাতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা আয়শা বেগম বলেন, “নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই বিভিন্নস্থানে ভাঙন ও ত্রুটি দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি ওয়াশ ব্লক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকা এবং অনেক বিদ্যালয়ে দপ্তরি না থাকায় নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাও করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ব্যবহার করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।”
বরগুনা সদর, আমতলী, তালতলী, পাথরঘাটা ও বামনা উপজেলার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও একই চিত্র পরিলক্ষিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। শিক্ষকদের অভিযোগ যে, শিশুদের উপযোগী করে ওয়াশ ব্লক নির্মাণের কথা থাকলেও অনেক স্থাপনায় পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, পানি, পরিচ্ছন্নতা ও প্রয়োজনীয় সুবিধার অভাব রয়েছে। ফলে কাগজে-কলমে ওয়াশ ব্লক থাকলেও বাস্তবে নিরাপদ স্যানিটেশন নিশ্চিত হচ্ছে না।
বরগুনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু জাফর মো. ছালেহ বলেন, “বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ স্যানিটেশন নিশ্চিত করতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে একাধিকবার জানানো হয়েছে। কিন্তু বিষয়টি তারা গুরুত্ব দিয়ে দেখছে না।”
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ঠিকাদারদের আবেদনের পর ওয়াশ ব্লক নির্মাণের জন্য কয়েক দফা সময় বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ গত জুনে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত কাজ শেষ করার সময় নির্ধারণ করা হয়। তবে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও জেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে ওয়াশ ব্লকের নির্মাণকাজ এখনো অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর বরগুনার সহকারী প্রকৌশলী রেজাউল কবিরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো বক্তব্য দিতে পারবেন না বলে জানান।
প্রকল্পের মেয়াদ বারবার বাড়ানোর পরও কাজ শেষ না হওয়ায় ঠিকাদার নির্বাচন, তদারকি এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের জবাবদিহিতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। নিরাপদ স্যানিটেশন নিশ্চিত করতে দ্রুত অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করার পাশাপাশি নির্মিত ওয়াশ ব্লকগুলোর মান যাচাই এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।