মেহেরপুর পৌর এলাকায় বর্তমানে পানির উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। এমন চরম সংকটের সময়ে ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পানি শোধনাগারটি চার বছর পার হয়ে গেলেও চালু করা সম্ভব হয়নি, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই চরম অব্যবস্থাপনার ফলে একদিকে যেমন সাধারণ নাগরিকেরা সুপেয় পানির মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে জনগণের করের টাকায় নির্মিত একটি বিশাল প্রকল্প অকার্যকর হয়ে পড়ে নষ্ট হচ্ছে।

মুক্তকণ্ঠের অনুসন্ধানে জানা গেছে, মেহেরপুর শহরের পশুর হাট সংলগ্ন এলাকায় সুপেয় পানির সংকট দূর করার লক্ষ্যে ২০১৫ সালে নতুন ভূগর্ভস্থ পানি শোধনাগার নির্মাণের কাজ শুরু করে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। দীর্ঘ প্রচেষ্টায় ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। এরপর ২০২৪ সালের নভেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে শোধনাগারটি পৌরসভা কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

পৌর শহরের বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে বোঝা যায়, মেহেরপুর পৌরসভায় পানিসংকট এখন কতটা প্রকট রূপ নিয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, পৌর কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যে পানি সরবরাহ করা হয়, তাতে ময়লা, পোকা ও শেওলা ভেসে আসে। এই পানি পান করা তো দূরের কথা, কেবল গোসল কিংবা কাপড় ধোয়ার মতো কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে।

পৌর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন শহরের মোট পানির চাহিদা প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ লিটার। কিন্তু বর্তমানে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ৫০ লাখ লিটার পানি। চাহিদার তুলনায় সরবরাহের এই বিশাল ঘাটতির কারণে অনেক নাগরিক বাধ্য হয়ে সাবমারসিবল পাম্প বসিয়েছেন অথবা বাজার থেকে পানি কিনে নিজেদের চাহিদা মেটাচ্ছেন। এর ফলে একদিকে যেমন ভূগর্ভস্থ পানির অপচয় বাড়ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের পকেট থেকেও বাড়তি অর্থ ব্যয় হচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি হলো, শহরের পানি সরবরাহ ব্যবস্থার প্রায় ১৫০ কিলোমিটার পাইপলাইনের ৫৫ শতাংশই আয়রনের স্তরে জমে পানি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে অনেক এলাকায় পানি একেবারেই পৌঁছাচ্ছে না। এই বাস্তবতায় কেবল নতুন শোধনাগার চালু করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; বরং পানি উৎপাদনের পাশাপাশি তা নিরাপদভাবে মানুষের ঘরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য পুরো বিতরণ ব্যবস্থা সচল করতে হবে।

এই সংকটময় পরিস্থিতিতে পৌরসভা এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য অত্যন্ত হতাশাজনক। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের দাবি, শোধনাগারটি চালু থাকা অবস্থাতেই পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বিপরীতে পৌরসভার দাবি, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষিত জনবল এবং অর্থের অভাবে এটি চালু করা যাচ্ছে না। এখানে বড় প্রশ্ন হলো, যে প্রতিষ্ঠান শোধনাগারটি পরিচালনা করবে, তাদের প্রয়োজনীয় জনবল ও সক্ষমতা নিশ্চিত না করেই এত বড় প্রকল্প কেন নেওয়া হলো? আবার হস্তান্তরের পর তা চালু না করার দায়ভার কে গ্রহণ করবেন?

নতুন পানি শোধনাগার নির্মিত হওয়ার পরও এই চরম অব্যবস্থাপনা চলতে দেওয়া যায় না। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং পৌরসভাকে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। দ্রুত প্রয়োজনীয় কারিগরি জনবল নিয়োগ ও যথাযথ প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে নতুন শোধনাগারটি কার্যকর করতে হবে। পাশাপাশি পুরোনো পাইপলাইনগুলো সংস্কার বা প্রতিস্থাপন করতে হবে এবং নিয়মিত পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নাগরিকদের সুপেয় পানি পাওয়ার অধিকারকে আর এভাবে বঞ্চিত করা যাবে না।