নদীভাঙন রোধে প্রতিবছর একই ধরনের কাজ করে অর্থ ব্যয়ের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই নদী ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রহণ করার পরামর্শ দিয়েছে জাতীয় সংসদের সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত কমিটি। কমিটির সদস্যদের মতে, বর্তমানে যে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, সেই সীমিত সম্পদের মধ্যেই কীভাবে দীর্ঘস্থায়ী ও কার্যকর কাজ করা যায়, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।

আজ বুধবার জাতীয় সংসদ ভবনে কমিটির এক বিশেষ বৈঠকে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে (পাউবো) এই বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। নদী শাসন ও বাঁধ নির্মাণে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের কথা বলে বৈঠকে প্রয়োজনে চীন ও নেদারল্যান্ডসে কীভাবে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হয়, সেই অভিজ্ঞতা গ্রহণ করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।

বৈঠকটিতে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং এর আওতাধীন দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা—পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার (ওয়ারপো) চলমান বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে পাউবো কর্তৃপক্ষ তাদের বাজেট ও বরাদ্দের স্বল্পতার বিষয়টি কমিটির সামনে তুলে ধরে। তবে কমিটি মনে করে, নদীভাঙন রোধে বর্তমানে যে ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা টেকসই হচ্ছে না। ফলে প্রায় প্রতিবছরই একই জায়গায় পুনরায় কাজ করতে হচ্ছে, যা অর্থের অপচয়। তাই বিদ্যমান বরাদ্দের মধ্যেই টেকসই সমাধান খোঁজার তাগিদ দেওয়া হয়।

পাউবোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বন্যা ব্যবস্থাপনা ও নদী সুরক্ষায় তারা এখন পর্যন্ত ১৬ হাজার ৬৬৮ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করেছে। এছাড়া ৩ হাজার ৯৮১ কিলোমিটার নদী পুনঃখনন, ১ হাজার ৬৩০ কিলোমিটার নদী ড্রেজিং এবং ১ হাজার ৭৬৮ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণের কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি উপকূলীয় অঞ্চলের সুরক্ষায় ১৩৯টি পোল্ডার নির্মাণ করেছে সংস্থাটি।

বৈঠক শেষে সংসদ সচিবালয়ের পক্ষ থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, নদীভাঙন রোধে স্বল্পমেয়াদি ও পুনরাবৃত্তিমূলক ব্যয়ের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই নদী ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে কমিটি। নদী শাসনে আধুনিক প্রযুক্তি ও গবেষণালব্ধ অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর তাগিদ দেওয়া হয়। পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ পলি ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত ও ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং নাব্যতা রক্ষায় সমন্বিত কৌশল গ্রহণের সুপারিশ করা হয়।

অন্যদিকে, বৈঠকে উত্তরাঞ্চলের তিনটি জেলার পানিসংকট নিয়ে ওয়ারপোর একটি গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ—এই তিন জেলার মোট ১৫৩টি ইউনিয়নের ৩ হাজার ৫৯৩টি মৌজাকে পানি সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনের বিস্তারিত তথ্যানুসারে, এই এলাকার মধ্যে ৪৭টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৪৬৯টি মৌজা ‘অতি উচ্চ পানি সংকটাপন্ন’। এছাড়া ৪০টি ইউনিয়নের ৮৮৪টি মৌজায় ‘উচ্চ’ এবং ৬৬টি ইউনিয়নের ১ হাজার ২৪০টি মৌজায় ‘মধ্যম’ পানি সংকট বিদ্যমান রয়েছে।

সংসদ সচিবালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে সংকটপূর্ণ এলাকায় গভীর নলকূপ স্থাপন কমানো, ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানো, ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমানো এবং পানির পুনর্ব্যবহার নীতি অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে কমিটির সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হুইপ মিয়া নূরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, হুইপ মো. আখতারুজ্জামান মিয়া, তাহসিনা রুশদীর, খোন্দকার আবু আশফাক, মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ, বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম, মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া ও মোহাম্মদ কামাল হোসেন।