মেহেরপুর পৌরসভার একটি নতুন পানি শোধনাগার নির্মাণে ব্যয় করা হয়েছে প্রায় ১০ কোটি টাকা। চার বছর আগে এই নির্মাণকাজ শেষ হলেও এখন পর্যন্ত সেখান থেকে পানি সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে, পুরোনো শোধনাগারটির কার্যক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পাওয়ায় পানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, যার ফলে পৌরসভার অর্ধলক্ষাধিক বাসিন্দা চরম সুপেয় পানির সংকটে ভুগছেন।
পৌরসভার হিসাব অনুযায়ী, শহরের প্রতিদিনের পানির চাহিদা প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ লিটার। তবে বর্তমানে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ৫০ লাখ লিটার। অর্থাৎ, প্রতিদিন চাহিদার তুলনায় প্রায় ৭০ লাখ লিটার পানি কম সরবরাহ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, কেবল পানির উৎপাদনই সমস্যা নয়, বরং পুরো সরবরাহব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে। পৌরসভার পানি পাইপলাইনের বিভিন্ন স্থানে আয়রন জমে পানি চলাচলে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে এবং কয়েকটি এলাকায় পাইপলাইন দিয়ে পানি সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
এই পরিস্থিতির বিষয়ে পৌরসভা কর্তৃপক্ষের দাবি, দক্ষ কারিগরি জনবল এবং প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে নতুন পানি শোধনাগারটি চালু করা যাচ্ছে না। তবে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের দাবি ভিন্ন; তাদের মতে, শোধনাগারটি চালু অবস্থাতেই পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। দুটি প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যের এই পরস্পরবিরোধী অবস্থানের কারণে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে পৌরবাসীর নিরাপদ পানির প্রাপ্তি।
গত বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় পৌর শহরের স্টেডিয়াম পাড়ায় সালেহা খাতুনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তিনি পৌরসভার সরবরাহ করা পানি পাত্রে সংরক্ষণ করেছেন। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “পানি নোংরা ও দুর্গন্ধ। আমরা এই পানি দিয়া গরু গোসল করাই, কাপড় পরিষ্কার করি। এই যে দেখছেন পানি ধরে রাখছি, এই পানি কি খাওয়া যায়?”
পৌরসভার প্রকৌশলী হারুন উর রশিদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “দক্ষ জনবলের অভাবে নতুন শোধনাগার চালু করা যাচ্ছে না। আবার পুরোনো শোধনাগার সংস্কারেও অনেক টাকা প্রয়োজন। পানির পাইপলাইনে আয়রন জমেছে। নতুন পাইপলাইন বসানো দরকার। সরকারি উদ্যোগ ছাড়া পৌরসভার পক্ষে এত টাকা ব্যয় করা কঠিন।”
শহরের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের স্টেডিয়াম পাড়ার বাসিন্দা সুফিয়া বেগম, আনজুরা খাতুন ও প্রিয়া খাতুনের অভিযোগ, প্রায় সাত বছর ধরে পৌরসভার সরবরাহ করা পানিতে ময়লা, পোকা ও শেওলা আসছে। এই কারণে তাঁরা ওই পানি পান করেন না; কেবল গোসল ও কাপড় ধোয়ার মতো কাজে ব্যবহার করেন। একই সমস্যায় পড়েছেন শহরের মল্লিকপাড়ায় পরিবারের সঙ্গে ভাড়া বাসায় থাকা সরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা ফয়সাল হোসেন। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, এখানে বদলি হয়ে আসার পর সুপেয় পানির সংকটকে বড় সমস্যা হিসেবে দেখেছেন। পৌরসভার পানিতে ময়লার সঙ্গে কেঁচোও আসে। এ কারণে প্রতিদিন তাঁকে ২০ লিটারের বোতলজাত পানি কিনতে হয়।
শহরের বস্ত্র ব্যবসায়ী মানিক হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “পৌরসভার সরবরাহ করা পানিতে দুর্গন্ধ থাকে। কখনো কখনো ময়লাও আসে। অনেকে নিজ উদ্যোগে সাব-মারসিবল পাম্প বসিয়ে পানি উত্তোলন করে ব্যবহার করছেন।”
পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, শহরের সুপেয় পানির গ্রাহক ৪ হাজার ৩৭০ জন। কিন্তু চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ায় সব এলাকায় সমানভাবে পানি পৌঁছাচ্ছে না। যাঁরা বিকল্প উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করতে পারছেন না, তাঁদের দুর্ভোগ আরও বেশি।
সুপেয় পানির সংকট নিরসনে শহরের পশুরহাট-সংলগ্ন এলাকায় নতুন ভূগর্ভস্থ পানি শোধনাগার নির্মাণের কাজ ২০১৫ সালে শুরু করেছিল জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। ২০২২ সালের এপ্রিলে নির্মাণকাজ শেষ হয়। পরে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষে ২০২৪ সালের নভেম্বরে শোধনাগারটি আনুষ্ঠানিকভাবে পৌরসভা কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মেহেরপুর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মোসলেহ উদ্দিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ভূগর্ভস্থ পানি শোধনাগারের কাজ সম্পন্ন করে সেটি চালু অবস্থায় পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পৌরসভা চাইলে যেকোনো সময় এটি চালু করতে পারে।”
পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, নতুন শোধনাগারের পানি পরীক্ষার জন্য পরীক্ষাগারকর্মী, প্ল্যান্ট অপারেটর, ইলেকট্রিশিয়ান ও যন্ত্রপাতি মেরামতের জন্য প্রশিক্ষিত কর্মী প্রয়োজন। এ ধরনের শোধনাগার পরিচালনায় চার থেকে ছয়জন প্রশিক্ষিত কারিগরি কর্মী দরকার। তবে শোধনাগারটি চালু করতে কত টাকা লাগবে এবং কবে নাগাদ এটি চালু করা সম্ভব—সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করে কিছু জানাননি পৌর কর্তৃপক্ষ।
শহরে পানির সরবরাহ লাইন প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ। দীর্ঘদিন পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ না করায় পাইপলাইনের ভেতরে আয়রন জমেছে। বড় বাজার, মুখার্জিপাড়া ও হালদারপাড়ায় একেবারেই পানি সরবরাহ হচ্ছে না। শহরের মোট পানির পাইপলাইনের প্রায় ৫৫ শতাংশে আয়রন জমে পানি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা রাকিব আহমেদ বলেন, দীর্ঘদিনের এ সংকট দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন। নিরাপদ পানি না পেলে পৌরবাসীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়বে।
এ বিষয়ে পৌরসভার প্রধান সহকারী এস এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, “নতুন শোধনাগার চালু করলেই সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পানি শোধনের পর নিরাপদভাবে গ্রাহকের বাড়িতে পৌঁছানোর জন্য পাইপলাইনের অবস্থা পরীক্ষা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি। এ জন্য সরকারি বরাদ্দ প্রয়োজন।”