নদী ও খালের প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও পানযোগ্য মিঠাপানির তীব্র অভাব। লবণাক্ততার প্রকোপে দীর্ঘকাল ধরে সুপেয় পানির সংকটে বিপর্যস্ত সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা। নিরাপদ পানির খোঁজে তাঁদের অনেক দূর পথ পাড়ি দিতে হয়, যার ফলে সবচেয়ে বেশি কষ্ট ভোগ করেন স্থানীয় নারীরা। এই মানবিক সংকট নিরসনে উপজেলার খাগড়াঘাট ও কৈখালী গ্রামে দুটি সুপেয় পানি শোধনাগার স্থাপন করা হয়েছে।

শিল্পপ্রতিষ্ঠান আবুল খায়ের গ্রুপের অর্থায়নে নির্মিত এই শোধনাগার দুটি গতকাল শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন প্রতিষ্ঠানটির করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড লিগ্যাল বিভাগের প্রধান শেখ শাবাব আহমেদ। খাগড়াঘাটে নূর উদ্দীনের বাড়ির সামনে এবং কৈখালীতে আলাউদ্দিন মল্লিকের বাড়ির সামনে এই দুটি শোধনাগার বসানো হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বর্ষাকালে দুই থেকে তিন মাস বৃষ্টির পানি জমিয়ে রেখে তারা ব্যবহার করতে পারেন। তবে বছরের বাকিটা সময় সুপেয় পানির জন্য তাঁদের দীর্ঘ পথ হাঁটতে হয়। বিশেষ করে নারীদের পানি সংগ্রহের পেছনে দিনের একটি বড় অংশ ব্যয় হয়ে যেত। এখন নতুন শোধনাগার চালু হওয়ায় খুব কাছেই পানি সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হয়েছে। খাগড়াঘাটের বাসিন্দা রহিমা বেগম (৪৫) বলেন, ‘আগে বৃষ্টির পানি দিয়ে কয়েক মাস চলত। বাকি সময় লোনা পানি পান করতে হতো। এখন কল চালু করলেই মিঠাপানি পাওয়া যাচ্ছে। এতে আমাদের অনেক কষ্ট কমবে।’

কৈখালীর ষাটোর্ধ্ব আমেনা খাতুন জানান, আগে এক কলস মিঠাপানি সংগ্রহ করতে তাঁকে দুই থেকে তিন মাইল পথ হাঁটতে হতো। এখন বাড়ির কাছেই পানি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় তাঁর স্বস্তি প্রকাশ করেন।

প্রযুক্তিগত দিক থেকে এই শোধনাগার দুটিতে রিভার্স অসমোসিস (আরও) পদ্ধতি ব্যবহার করে পানি পরিশোধন করা হচ্ছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের খুলনা আঞ্চলিক পরীক্ষাগারে পানির নমুনা পরীক্ষা করে এর গুণগত মান নিশ্চিত করা হয়েছে। পানি সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি ডিজিটাল কার্ডের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। নির্দিষ্ট যন্ত্রে কার্ড স্পর্শ করলে পানি সরবরাহ শুরু হবে এবং কার্ড সরিয়ে নিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পানি আসা বন্ধ হয়ে যাবে, যা পানির অপচয় রোধ করবে। প্রতি লিটার পানির পরিচালন ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০ পয়সা।

বিদ্যুৎ খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা করতে প্রতিটি শোধনাগারে ১০টি করে সৌর প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। প্রকল্পটিতে কারিগরি সহায়তা প্রদান করছে খান ট্রেডার্স। এছাড়া স্থানীয় তরুণদের সংগঠন শরুব ইয়ুথ ক্লাবের সদস্যরা এই শোধনাগারগুলোর দৈনন্দিন পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করছেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আবুল খায়ের গ্রুপের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড লিগ্যাল বিভাগের প্রধান শেখ শাবাব আহমেদ বলেন, “উপকূলীয় মানুষের সুপেয় পানির সংকট তাঁদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিশ্চিত করতে তাঁরা এই উদ্যোগ নিয়েছেন।”

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য প্রদান করেন আবুল খায়ের গ্রুপের সিআর প্রধান ফেরদৌস ফয়সল, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বারসিকের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী শাহিন ইসলাম, শ্যামনগর উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি সামিউল আজম মনির, স্থানীয় সমাজসেবক মহিউদ্দীন সরদার, তাজউদ্দীন আহমেদ এবং প্রকল্পের সভাপতি ও জমিদাতা নূর উদ্দীন সরদার। পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন শরুব ইয়ুথ টিমের সভাপতি জান্নাতুন নাইম।