দীর্ঘদিনের পর্যটক খরা কাটিয়ে শারদীয় দুর্গাপূজার ছুটিতে পর্যটকদের পদচারণে মুখর হয়ে উঠেছে সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ। বনের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের নিয়ে ছুটে আসছেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ায় ব্যস্ততা ফিরেছে ট্রলারঘাট, রিসোর্ট ও স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে। এতে দীর্ঘদিনের মন্দা কাটিয়ে নতুন করে আশার আলো দেখছেন পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষ।

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জের দোবেকী ও কলাগাছিয়া ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্রে পর্যটকদের উপস্থিতি বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এক থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত এ রেঞ্জে আনুমানিক পাঁচ হাজার পর্যটক ভ্রমণ করেছেন। এর মধ্যে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত পূজার ছুটিতে পর্যটক এসেছেন আড়াই হাজারের বেশি। এর আগে সেপ্টেম্বর মাসে চারজন বিদেশিসহ দুই হাজার ৫৮৬ জন পর্যটক সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে ভ্রমণ করেন।

পর্যটকদের এই বাড়তি উপস্থিতিতে কর্মচাঞ্চল্য ফিরেছে নীলডুমুর, মুন্সিগঞ্জ ও বুড়িগোয়ালিনী এলাকার নৌঘাটগুলোতে। পর্যটকদের বনে ঘোরাতে দিনভর ব্যস্ত সময় পার করছেন ট্রলারের মালিক, চালক ও শ্রমিকেরা। পাশাপাশি পর্যটকদের কাছে পানি, বিস্কুট, ফলমূল ও শুকনো খাবার বিক্রি বেড়েছে স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের।

জেলার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি আনিছুর রহমান বলেন, “পূজার ছুটিতে পর্যটক বেড়ে যাওয়ায় নীলডুমুর, মুন্সিগঞ্জ ও বুড়িগোয়ালিনী ঘাট থেকে দিনভর ট্রলার ভাড়া হচ্ছে। দীর্ঘদিন অলস পড়ে থাকা ট্রলারগুলো আবার কাজে লাগছে। এতে শ্রমিকদের আয়-রোজগারও বেড়েছে। নীলডুমুর ঘাট থেকে ২০ থেকে ২৫ জন ধারণক্ষমতার একটি ট্রলারে কলাগাছিয়া যেতে ভাড়া পড়ছে দুই হাজার থেকে দুই হাজার ১০০ টাকা। আর মুন্সিগঞ্জ ট্যুরিস্ট ঘাট থেকে ট্রলারের আকারভেদে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে তিন হাজার ৫০০ থেকে চার হাজার টাকা।”

নীলডুমুরের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, “অনেক দিন পর তাদের বেচাকেনা ভালো হচ্ছে। দূরদূরান্ত থেকে পর্যটকেরা আসছেন। তাদের কাছে পানি, বিস্কুট, ফলমূল ও বিভিন্ন ধরনের শুকনো খাবার বিক্রি বেড়েছে।”

পর্যটকদের ভিড় বেড়েছে সুন্দরবনসংলগ্ন রিসোর্টগুলোতেও। শ্যামনগর উপজেলা প্রশাসন পরিচালিত আকাশলীনা ইকো-ট্যুরিজম সেন্টার ও রেস্ট হাউসের পাশাপাশি সুশীলন টাইগার পয়েন্ট, রিসোর্ট মুন্সিগঞ্জ ও বর্ষা রিসোর্টে পর্যটকদের আনাগোনা বেড়েছে।

পর্যটকেরা জানান, সুন্দরবনের নদী-খাল, সবুজ বনভূমি ও বন্য প্রাণী কাছ থেকে দেখার আকর্ষণেই তাদের এই ভ্রমণ। বন বিভাগের নির্দেশনা মেনে নিরাপদে বনের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পেরে তারা আনন্দিত।

যশোর থেকে পরিবারের পাঁচ সদস্য নিয়ে তিন দিনের ভ্রমণে এসেছেন চাকরিজীবী অসিত অধিকারী। শ্যামনগরের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ঘুরে একটি রিসোর্টে উঠেছেন তারা। সকালে পরিবার নিয়ে সুন্দরবন ভ্রমণে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। অসিত অধিকারী বলেন, “পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভালো সময় কাটাচ্ছেন। কলাগাছিয়ায় গিয়ে তার ছোট ছেলে-মেয়েরা বানর ও হরিণ দেখে অভিভূত হয়েছে।”

মেহেরপুর থেকে আসা বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ১০ শিক্ষার্থীর একটি দলও ঘুরে দেখেছে সুন্দরবনের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান। তাদের মধ্যে প্রদীপ, শ্যামল দত্ত ও বিকাশ কুন্ড জানান, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, বন্য প্রাণী এবং উপকূলীয় মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

সুশীলন টাইগার পয়েন্টের ব্যবস্থাপক আব্দুল হামিদ বলেন, “দীর্ঘদিন পর্যটন ব্যবসায় মন্দাভাব ছিল। পূজার ছুটিতে হঠাৎ পর্যটক বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তুলনামূলক কম খরচে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা এবং সুন্দরবনে ঘোরার জন্য ট্রলারের সুবিধা থাকায় পর্যটকেরা এখানে আসছেন। বর্তমানে তাদের রিসোর্টের কক্ষও খালি নেই।”

বর্ষা রিসোর্টের ব্যবস্থাপক বিশ্বজিৎ মণ্ডল বলেন, “দুর্গাপূজার ছুটিতে দূরদূরান্ত থেকে পরিবার নিয়ে পর্যটকেরা তাদের রিসোর্টে আসছেন। বর্তমানে রিসোর্টের কোনো কক্ষ খালি নেই।”

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক ও রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. শাহিনুর ইসলাম বলেন, “পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে বন বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পর্যটকদের নির্ধারিত নিয়ম মেনে বনে প্রবেশ ও ভ্রমণ করতে হচ্ছে। সাতক্ষীরা রেঞ্জের স্টেশনগুলো থেকে সাধারণত এক দিনের ভ্রমণ পাস দেওয়া হয়। একাধিক দিনের ভ্রমণ পাস খুলনা বিভাগের কার্যালয় থেকে ইস্যু করা হয়।”

তিনি আরও বলেন, “শারদীয় দুর্গাপূজার ছুটিতে পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে। আগামী কয়েক দিনেও পর্যটকের সংখ্যা বাড়তে পারে। পর্যটকদের নিরাপত্তায় বন বিভাগের পাশাপাশি কোস্টগার্ড ও নৌপুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে।”