বরগুনায় বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) অর্থায়নে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি রিং বেড়িবাঁধ নির্মাণের মাত্র দুই মাসের মধ্যেই বিভিন্ন স্থানে ধসে পড়েছে। পোটকাখালী আশ্রয়ণ প্রকল্পে দুর্যোগ ঝুঁকি প্রশমনের লক্ষ্যে এই বাঁধটি তৈরি করা হলেও এখন দেখা যাচ্ছে এর গাইডওয়ালসহ বড় অংশই খালে মিশে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নির্মাণকাজে যথাযথ তদারকির অভাব এবং নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের কারণেই এত দ্রুত বাঁধটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বরগুনা সদর উপজেলার পোটকাখালী আশ্রয়ণ প্রকল্পে দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে এই রিং বেড়িবাঁধটি নির্মাণ করা হয়। এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা জাগোনারী। তবে স্থানীয়দের দাবি, বাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত কারিগরি নিয়মগুলো অনুসরণ করা হয়নি। তাদের অভিযোগ অনুযায়ী, বাঁধ নির্মাণে ৪০ শতাংশ মাটি দূর থেকে পরিবহন করে আনার কথা থাকলেও বাস্তবে তা করা হয়নি। পরিবর্তে বাঁধের পাশের খাল খনন করে সেখান থেকে প্রাপ্ত মাটি দিয়েই বাঁধটি তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে বাঁধের পাশের অংশ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বাঁধ ও গাইডওয়াল খালে ধসে পড়ে।
কেবল গুণগত মান নয়, বাঁধের দৈর্ঘ্য নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পে ৬৫০ মিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধ নির্মাণের কথা থাকলেও বাস্তবে মাত্র ৬২৮ মিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে।
পোটকাখালী আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ বাবুল খান বলেন, “বাঁধের পাশের খাল খনন করে সেই মাটি দিয়ে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এতে অল্প সময়ের মধ্যেই বাঁধ ও গাইডওয়াল খালে ধসে পড়েছে।”
স্থানীয় বাসিন্দা খালেক হাওলাদার অভিযোগ করে বলেন, “উন্নয়ন সংস্থা জাগোনারী সঠিকভাবে তদারকি না করায় কাজের গুণগত মান খারাপ হয়েছে। নির্মাণের দুই মাসের মধ্যেই বাঁধের বিভিন্ন অংশে ভাঙন দেখা দিয়েছে। তাই কাজে অনিয়মের দায় জাগোনারী এড়াতে পারে না।”
আরেক বাসিন্দা মোহাম্মদ রফিক বলেন, “নিম্নমানের গাইড ওয়ালের কারণে বাঁধ ধসে পড়েছে। দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাঁধ থেকে এলাকার মানুষ কতটা সুফল পাবে, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। দুই মাসেই যদি ভাঙন দেখা দেয়, তাহলে সামনে বাঁধটির অস্তিত্ব থাকবে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ আছে।”
এদিকে, কাজের তদারকি প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম। তিনি জানান, কাজের তদারকির জন্য এলজিইডির সদর উপজেলা প্রকৌশলী, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নিয়ে একটি তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তবে তার দাবি, জাগোনারী নামমাত্রভাবে কমিটিতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছে, কিন্তু তদারকির জন্য তাদের কখনোই ডাকা হয়নি।
এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে জাগোনারীর প্রধান নির্বাহী হোসনে-আরা হাসি বলেন, “আমি শুধু অর্থপ্রাপ্তির মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছি। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি আমাদের মাধ্যমে অর্থ দিয়েছে। তবে কাজটি বাস্তবায়ন করেছে ঢলুয়া ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি।”
অন্যদিকে, ঢলুয়া ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মো. সাখাওয়াত হোসেন দাবি করেন, কাজের তদারকি থেকে শুরু করে সবকিছুই ছিল জাগোনারীর নিয়ন্ত্রণে। তাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি কেবল কাজ শেষ হওয়ার পর ঠিকাদারের অর্থ ছাড় করার প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করেছে।
কাজে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদার মো. মিল্টন দাবি করেন, নকশায় ত্রুটি থাকার কারণেই বাঁধটি ধসে পড়েছে। তিনি জানান, বর্ষা মৌসুম শেষ হলে ধসে পড়া অংশগুলো মেরামত করা হবে।
বরগুনা সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শাহ আজিজ জানান, বেড়িবাঁধ ধসে পড়ার বিষয়টি তিনি জানতে পেরেছেন। তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, নির্মাণকাজে অনিয়ম হয়ে থাকলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।