আজ ১৫ অক্টোবর, বিশ্ব হাতধোয়া দিবস। এই বিশেষ দিনে যখন বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে হাত ধোয়ার গুরুত্ব প্রচার করা হচ্ছে, তখন পঞ্চগড়ের অধিকাংশ বিদ্যালয়ের ওয়াশ ব্লক ও টয়লেটে হাত পরিষ্কারের জন্য ন্যূনতম সাবানটুকুও নেই। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং অপরিচ্ছন্ন বাথরুমের কারণে কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছে বলে জানা গেছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) জেলা শহরের বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর ওয়াশ ব্লকে চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বিরাজ করছে। অধিকাংশ বেসিনে কোনো সাবান নেই। ফলে বাথরুম ব্যবহারের পর স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে পরিচ্ছন্ন হওয়ার কোনো কার্যকর ব্যবস্থাও সেখানে নেই।
পঞ্চগড় জেলা শহরের পঞ্চগড়-২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ডোকরোপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দ্বারিকামারী-২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং বড়দহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরিদর্শনে গিয়ে এই হতাশাজনক চিত্র দেখা গেছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সাবান ছাড়াই তাদের হাত ধুতে হয়। ওয়াশ ব্লকে নিয়মিত সাবান পাওয়া যায় না। ফলে টয়লেট ব্যবহারের পর কিংবা খাবার খাওয়ার আগে অনেক সময় শুধু পানি দিয়েই হাত ধুতে হয়। সাবান থাকলে তারা তা দিয়ে হাত পরিষ্কার করতে পারত বলে জানায় শিক্ষার্থীরা।
দ্বারিকামারী-২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ওয়াশ ব্লক ঘুরে দেখা যায়, একটিতে সাবান থাকলেও বাকি তিনটিতে ছিল না। পরে প্রধান শিক্ষক ছালেহা তাজমীকে বিষয়টি জানানোর পর তিনি তাৎক্ষণিকভাবে অন্য বেসিনগুলোতেও সাবানের ব্যবস্থা করেন।
পঞ্চগড়-২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ঝর্না ইয়াসমিন বলেন, “আমরা প্রতিনিয়ত ওয়াশ ব্লকে সাবান দিই। কিন্তু বাচ্চারা সাবান ফেলে দেয়। এ ছাড়া বাইরের অনেক মানুষও এখানে আসে, তারাও সাবান ফেলে দেয়। আমরা প্রতিদিনই ওয়াশ ব্লকে সাবান দেওয়ার চেষ্টা করি।”
ডোকরোপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রবীর কুমার সেন বলেন, “আমাদের বিদ্যালয়ে দুটি ওয়াশ ব্লক থাকলেও দুটিই নষ্ট। এগুলো বারবার মেরামত করা হলেও বিদ্যালয় ছুটির পর কে বা কারা আবার নষ্ট করে দেয়। ওয়াশ ব্লকগুলো লোহার খাঁচা দিয়ে সুরক্ষিত করা গেলে এ সমস্যা কমতে পারে।” এ ছাড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় নিয়মিত সাবান সরবরাহের ক্ষেত্রে খরচের সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন।
বড়দহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শরীফা বেগম বলেন, “সম্প্রতি নতুন শিক্ষকরা বিদ্যালয় পরিদর্শনে এসেছিলেন। তাদের আসার আগে ওয়াশ ব্লক পরিষ্কার করে সাবান দেওয়া হয়েছিল। পরে শিক্ষার্থীরা হয়তো সাবানগুলো ফেলে দিয়েছে।”
সচেতন নাগরিক মেহেদী হাসান খান বাবলা বলেন, “বিশ্ব হাতধোয়া দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো সাবান ও পানি দিয়ে সঠিক নিয়মে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং রোগ সংক্রমণ প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এ অভ্যাস গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টয়লেট ব্যবহারের পর এবং খাবার খাওয়ার আগে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া নানা রোগের জীবাণুর সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে। কিন্তু বিদ্যালয়ে সাবানের অনুপস্থিতি, ওয়াশ ব্লক নষ্ট থাকা এবং সরবরাহ করা সাবান সংরক্ষণে সমস্যার কারণে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণে বাধার মুখে পড়ছে।”
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইয়াকুব আলী মিঞা বলেন, “আমাদের জেলার সব বিদ্যালয়ে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান করা হয়। শিক্ষার্থীদের ওয়াশরুম ব্যবহারের পরসহ সবসময় সাবান-পানি দিয়ে পরিচ্ছন্ন হতে সাবানের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে এর কোনো ব্যত্যয় ঘটলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।”
সিভিল সার্জন ডা. মিজানুর রহমান বলেন, “ওয়াশ ব্লকে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, স্বাস্থ্যবিধির অভাব এবং সাবান না থাকা অত্যন্ত গুরুতর সমস্যা, যা শিক্ষার্থী বা ব্যবহারকারীদের বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলে। শুধু পানি দিয়ে হাত ধুলে জীবাণু পুরোপুরি দূর হয় না। ফলে ডায়রিয়া, টাইফয়েড বা জন্ডিসের মতো পানিবাহিত ও ছোঁয়াচে রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।”