গোসল করতে গেলে অনেকেরই প্রস্রাবের চাপ অনুভব হয়। কেউ কেউ এসময়ই প্রস্রাব করে নেন। এতে সময় বাঁচার পাশাপাশি কমে যায় টয়লেট ফ্লাশ করার প্রয়োজনও। কিন্তু গোসলের সময় প্রস্রাব করার অভ্যাস কি আসলেই শরীরের জন্য ক্ষতিকর? এতে কি আমাদের মূত্রথলি বা পেলভিক ফ্লোরের পেশিতে সমস্যা হয়?

স্বাস্থ্যবিষয়কেএকটি ওয়েবসাইটের প্রতিবেদনে গোসলের সময় প্রস্রাব করার সম্ভাব্য সুবিধা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিজের পরিষ্কার গোসলখানায় পানি চলমান থাকা অবস্থায় প্রস্রাব করলে অধিকাংশ সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা নেই। তবে কিছু শারীরিক সমস্যা থাকলে এই অভ্যাস এড়িয়ে চলাই সবচেয়ে ভালো।

গোসলের সময় প্রস্রাব করলে কি শরীরের ক্ষতি হয়

সুস্থ একজন মানুষ সাধারণভাবে নিজের গোসলখানায় গোসলের সময় প্রস্রাব করলে তা বড় ধরনের স্বাস্থ্যসমস্যার কারণ না। মূলত প্রস্রাবের সঙ্গে শরীরের অতিরিক্ত পানি ও বিভিন্ন বর্জ্য পদার্থ বেরিয়ে যায়। চলমান পানির সঙ্গে প্রস্রাব ড্রেন দিয়ে চলে গেলে পরিষ্কার রাখাও তুলনামূলক সহজ হয়।

তবে মনে রাখতে হবে, প্রস্রাব পুরোপুরি জীবাণুমুক্ত হয় না। যেকোনো সুস্থ মানুষের প্রস্রাবেও অল্প পরিমাণে ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে। আবার মূত্রনালির সংক্রমণ বা অন্য কোনো সংক্রমণ থাকলে প্রস্রাবে জীবাণুর উপস্থিতি বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

তাই নিজের ব্যক্তিগত গোসলখানা এবং অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে ব্যবহার করা গোসলখানার বিষয়টি একভাবে দেখা ঠিক না। বিশেষ করে জনসাধারণের গোসলখানা, জিম বা সুইমিংপুলের শাওয়ার ব্যবহার করার সময় পরিচ্ছন্নতার দিকে নজর দেওয়া জরুরি।

গোসলের সময় প্রস্রাব করার সম্ভাব্য ৪টি সমস্যা দেখা দিতে পারে-

পেলভিক ফ্লোরের পেশিতে চাপ পড়তে পারে

পেলভিক ফ্লোর হলো শ্রোণির নিচের অংশে থাকা একগুচ্ছ পেশি ও টিস্যু, যা মূত্রথলি, অন্ত্র এবং অন্যান্য অঙ্গকে সমর্থন দেয়। প্রস্রাব নিয়ন্ত্রণেও এই পেশিগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

প্রস্রাব করার সময় মূত্রথলি ও পেলভিক ফ্লোরের পেশিগুলোর সমন্বয় প্রয়োজন। সাধারণত বসে প্রস্রাব করলে অনেকের পেশি সহজে শিথিল হয়। কিন্তু দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করার সময়, বিশেষ করে যাদের পেশি শিথিল করতে অসুবিধা হয়, তাদের ক্ষেত্রে কিছুটা চাপ দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।

দীর্ঘদিন জোর করে প্রস্রাব করার অভ্যাস পেলভিক ফ্লোরের সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের জন্য অসুবিধা বাড়াতে পারে। তবে শুধু গোসলের সময় দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করলেই সবার পেলভিক ফ্লোর দুর্বল হয়ে যায়, এমন নিশ্চিত প্রমাণ নেই।

পানির শব্দে বারবার প্রস্রাবের চাপ অনুভূত হতে পারে

কলের পানি পড়ার শব্দ শুনলে কারও কারও প্রস্রাবের চাপ অনুভূত হয়। নিয়মিত গোসলের সময় প্রস্রাব করার অভ্যাসের সঙ্গে এই প্রতিক্রিয়ার সম্পর্ক থাকতে পারে। মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে পানির শব্দকে প্রস্রাব করার পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত করে ফেলতে পারে।

যাদের মূত্রথলি অতিসক্রিয়, প্রস্রাব ধরে রাখতে অসুবিধা হয় বা হঠাৎ তীব্র চাপ অনুভূত হয়, তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি বেশি বিরক্তিকর হতে পারে।

তবে পানির শব্দ শুনলেই প্রস্রাবের চাপ অনুভূত হওয়া মানেই কোনো রোগ হয়েছে, এমন নয়। সমস্যা নিয়মিত হলে বা দৈনন্দিন জীবনে অসুবিধা তৈরি করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

মূত্রথলি পুরোপুরি খালি না হওয়ার সমস্যা থাকতে পারে

সবার প্রস্রাব করার ধরন এক নয়। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করার সময় পেলভিক ফ্লোরের পেশি পুরোপুরি শিথিল হয় না। ফলে প্রস্রাবের স্বাভাবিক প্রবাহে অসুবিধা হতে পারে।

যাদের মূত্রথলি পুরোপুরি খালি হয় না, প্রস্রাবের প্রবাহ দুর্বল, প্রোস্টেট বড় হয়ে গেছে বা বারবার মূত্রনালির সংক্রমণ হয়, তাদের ক্ষেত্রে প্রস্রাবের ভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

এ ধরনের সমস্যা থাকলে গোসলের সময় দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করার বদলে টয়লেটে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে প্রস্রাব করা ভালো। প্রস্রাব আটকে থাকা, ব্যথা বা অসম্পূর্ণভাবে মূত্রথলি খালি হওয়ার অনুভূতি নিয়মিত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

যৌথ গোসলখানায় পরিচ্ছন্নতার সমস্যা হতে পারে

নিজের গোসলখানায় প্রস্রাব করা এবং অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে ব্যবহার করা গোসলখানায় প্রস্রাব করা এক বিষয় নয়। যৌথ গোসলখানায় অন্য ব্যবহারকারীদের সংক্রমণ, খোলা ক্ষত কিংবা ত্বকের সমস্যার বিষয়টি জানা সম্ভব হয় না।

প্রস্রাবের সঙ্গে জীবাণু থাকতে পারে। তাই জনসাধারণের শাওয়ার, জিমের গোসলখানা বা অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে ব্যবহার করা জায়গায় প্রস্রাব না করাই পরিচ্ছন্নতা ও অন্যের প্রতি সম্মানের দিক থেকে ভালো।

নিজের গোসলখানায় প্রস্রাব হয়ে গেলে চলমান পানি দিয়ে জায়গাটি ভালোভাবে ধুয়ে নিন এবং নিয়মিত পরিষ্কার করুন।

গোসলের সময় প্রস্রাব করলে কি পানি সাশ্রয় হয়?

গোসলের সময় প্রস্রাব করলে আলাদা করে টয়লেট ফ্লাশ করার প্রয়োজন নাও হতে পারে। সে কারণে কিছু পানি সাশ্রয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে বাস্তবে কতটা পানি বাঁচবে, তা নির্ভর করে টয়লেটের ফ্লাশে কত পানি লাগে এবং গোসলের সময় কত পানি ব্যবহার করা হয় তার ওপর। শুধু প্রস্রাব করার জন্য গোসলের সময় বাড়িয়ে দিলে বরং পানির ব্যবহার বেড়ে যেতে পারে।

তাই পানি সাশ্রয়ের কথা বিবেচনা করলেও পরিচ্ছন্নতা ও নিজের শারীরিক অবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়াই উচিত।

কারা গোসলের সময় প্রস্রাব করা এড়িয়ে চলবেন?

সবার ক্ষেত্রে এই অভ্যাস বন্ধ করা জরুরি নয়। তবে কিছু পরিস্থিতিতে সতর্ক থাকা ভালো। যেমন-

যাদের প্রস্রাব ধরে রাখতে অসুবিধা হয় বা হঠাৎ তীব্র চাপ আসে

যাদের পেলভিক ফ্লোরের পেশিতে সমস্যা রয়েছে

যাদের প্রস্রাবের প্রবাহ দুর্বল বা মূত্রথলি পুরোপুরি খালি হয় না

যাদের বারবার মূত্রনালির সংক্রমণ হয়

যাদের প্রোস্টেট বড় হওয়ার কারণে প্রস্রাব করতে সমস্যা হয়

যারা জনসাধারণের বা যৌথ গোসলখানা ব্যবহার করেন

এসব সমস্যা থাকলে টয়লেটে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বসেই প্রস্রাব করা ভালো। বিশেষ করে প্রস্রাব করতে জোর দিতে হয় বা ব্যথা হয়, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করবেন না।

প্রস্রাবের অভ্যাস নিয়ে কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

প্রস্রাব করার সময় ব্যথা বা জ্বালাপোড়া, প্রস্রাবে রক্ত, অস্বাভাবিক দুর্গন্ধের সঙ্গে অন্যান্য উপসর্গ, বারবার প্রস্রাবের চাপ, প্রস্রাবের প্রবাহ দুর্বল হওয়া কিংবা মূত্রথলি খালি না হওয়ার অনুভূতি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

প্রস্রাব একেবারেই করতে না পারলে, বিশেষ করে তলপেটে ব্যথা বা ফুলে যাওয়ার অনুভূতি থাকলে, জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।

গোসলের সময় প্রস্রাব করা নিয়ে অনেকের মনে অস্বস্তি বা দুশ্চিন্তা থাকলেও, নিজের পরিষ্কার গোসলখানায় পানি চলমান থাকা অবস্থায় মাঝেমধ্যে এমনটা করলে অধিকাংশ সুস্থ মানুষের বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা কম। তবে যাঁদের মূত্রথলি বা পেলভিক ফ্লোরের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে অভ্যাসটি অসুবিধা বাড়াতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রস্রাব করার সময় শরীরে জোর না দেওয়া, গোসলখানা পরিষ্কার রাখা এবং প্রস্রাবের কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।

সূত্র: হেল্থ

গোসলের সময় প্রস্রাব করা কি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর? জেনে নিন চিকিৎসকদের পরামর্শ, পেলভিক ফ্লোর ও মূত্রথলির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব, পরিচ্ছন্নতার ঝুঁকি এবং কোন পরিস্থিতিতে এই অভ্যাস এড়িয়ে চলা ভালো।