প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এল নিনোর প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় আবারও এক ভয়াবহ তাপপ্রবাহের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই চরম আবহাওয়ার স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় একযোগে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটান। থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আয়োজিত 'গ্লোবাল হিট ফোরাম'-এ এই চার দেশের তাপপ্রবাহ পরিস্থিতি, প্রস্তুতি এবং বিদ্যমান ঘাটতিগুলো বিশ্লেষণ করে চারটি পৃথক ‘কান্ট্রি ব্রিফ’ প্রকাশ করা হয়েছে।

গ্লোবাল হিট হেলথ ইনফরমেশন নেটওয়ার্কের (জিএইচএইচআইএন) দক্ষিণ এশিয়া হাবের উদ্যোগে এই মূল্যায়ন প্রতিবেদনগুলো প্রকাশ করা হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় চরম তাপের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি ক্রমাগত বাড়তে থাকায় দেশগুলোর প্রস্তুতি ও সক্ষমতা পর্যালোচনার অংশ হিসেবে এসব মূল্যায়ন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে দেশগুলো কীভাবে তীব্র গরম মোকাবিলা করছে, আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করছে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি রয়ে গেছে।

নয়াদিল্লিতে অবস্থিত কাউন্সিল অন এনার্জি, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ওয়াটার এই দক্ষিণ এশিয়া হাবটি পরিচালনা করছে। এর সহযোগী অংশীদার হিসেবে রয়েছে সাসটেইনেবল ফিউচার্স কোলাবোরেটিভ, ন্যাচারাল রিসোর্সেস ডিফেন্স কাউন্সিল, ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ এবং জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশন (ইউএনএসকাপ)। এছাড়া এই উদ্যোগটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) যৌথ জলবায়ু ও স্বাস্থ্য কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ায় তাপপ্রবাহের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব উভয়ই বৃদ্ধি পেয়েছে। অতিরিক্ত গরম কেবল শারীরিক অস্বস্তি তৈরি করে না, বরং শিশু, বয়স্ক, অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং খোলা আকাশের নিচে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করে। এর ফলে তাপজনিত অসুস্থতা ও মৃত্যুর পাশাপাশি হৃদ্‌রোগ এবং শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা বাড়ার আশঙ্কা থাকে।

নতুন এই মূল্যায়নের মূল লক্ষ্য হলো তাপের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় অর্জিত অগ্রগতি চিহ্নিত করা এবং কোথায় আরও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন তা নির্ধারণ করা। এই তথ্যগুলো নীতিনির্ধারণ, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার উন্নয়ন, আগাম সতর্কবার্তা প্রদান এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব।

ব্যাংককে অনুষ্ঠিত গ্লোবাল হিট ফোরামে দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ক্রমবর্ধমান তাপঝুঁকি এবং এর স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা চলছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভবিষ্যতে তাপপ্রবাহের ঝুঁকি আরও বাড়বে। তাই তাপকে কেবল একটি আবহাওয়াজনিত ঘটনা হিসেবে না দেখে জনস্বাস্থ্যের একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে মোকাবিলা করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ১৯৮০ সালের পর থেকে বাংলাদেশে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার সমন্বয়ে মানুষের শরীরে অনুভূত তাপমাত্রা প্রায় সাড়ে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। বর্তমানে বছরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সময় বিপজ্জনক আর্দ্র গরমের মধ্যে অতিবাহিত করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় তাপকে একটি ঝুঁকি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের জন্য দেশের প্রথম নগর তাপপ্রবাহ মোকাবিলা কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। তাপজনিত অসুস্থতা মোকাবিলায় জাতীয় নির্দেশিকা প্রণয়ন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে ‘বিট দ্য হিট’ প্রচার কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। তবে এসব পদক্ষেপ সত্ত্বেও জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে আলাদা ও সুনির্দিষ্ট তাপপ্রবাহ মোকাবিলা কর্মপরিকল্পনার ঘাটতি রয়ে গেছে। বিশেষ করে আবহাওয়ার পূর্বাভাসের সঙ্গে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে যুক্ত করে তাপজনিত অসুস্থতা পর্যবেক্ষণের একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি বলে সুপারিশ করা হয়েছে।

গ্লোবাল হিট হেলথ ইনফরমেশন নেটওয়ার্কের (জিএইচএইচআইএন) দক্ষিণ এশিয়া হাবের বাংলাদেশবিষয়ক প্রথম মূল্যায়নে এই তথ্য ও সুপারিশগুলো উঠে এসেছে। জিএইচএইচআইএনের দক্ষিণ এশিয়া হাব থেকে দেশ চারটির তাপ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে এটিই প্রথম মূল্যায়ন।

মূল্যায়ন প্রকাশের সময় জানানো হয়, প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো শক্তিশালী হচ্ছে, যার ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় তীব্র গরমের মৌসুমের ঝুঁকি বাড়ছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটান যৌথভাবে কাজ শুরু করেছে। চার দেশের মূল্যায়নে দেখা গেছে, পরিকল্পনা, আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও আগাম সতর্কবার্তার ক্ষেত্রে প্রস্তুতি সবচেয়ে দ্রুত এগিয়েছে। তবে এই পরিকল্পনাগুলোকে মাঠপর্যায়ের সুরক্ষায় রূপ দেওয়ার গতি ছিল ধীর। তাপজনিত অসুস্থতা পর্যবেক্ষণ, স্থানীয় পর্যায়ে অর্থায়ন এবং স্বাস্থ্য, শ্রম ও নগর-পরিকল্পনায় তাপের ঝুঁকি অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে এখনো বড় ঘাটতি রয়েছে।

একসময় দক্ষিণ এশিয়ার সমতল অঞ্চলেই তীব্র গরম বেশি দেখা যেত, কিন্তু এখন সেই প্রভাব হিমালয় অঞ্চলের নেপাল ও ভুটানেও ছড়িয়ে পড়ছে।

ব্র্যাক জেমস পি গ্র্যান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের ড. ফারজানা মিশা বলেন, ‘তাপ এই অঞ্চলের স্বাস্থ্যঝুঁকিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম স্বীকৃত একটি। বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের তুলনায় এটি কম দৃশ্যমান। কিন্তু স্বাস্থ্য, কাজ ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপর এর ক্ষতি কোনো অংশে কম নয়। বাংলাদেশে আমরা এরই মধ্যে কিছু উদ্যোগ নিতে শুরু করেছি। তাপজনিত অসুস্থতা মোকাবিলায় একটি জাতীয় নির্দেশিকা এবং নারায়ণগঞ্জে প্রথম নগর তাপপ্রবাহ মোকাবিলা কর্মপরিকল্পনা তৈরি হয়েছে। ঢাকা, রাজশাহী ও অন্যান্য নগর কেন্দ্রেও একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এখন দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে একই পদক্ষেপ প্রয়োজন। এমন স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়ন করতে হবে, যাতে গরম আসার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করা এবং মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগে ব্যবস্থা নেওয়া যায়।’

বাংলাদেশবিষয়ক মূল্যায়নে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরির পাশাপাশি আবহাওয়ার পূর্বাভাসকে হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত করে স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করার সুপারিশ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, ভারত তাপ মোকাবিলায় ত্রাণ কার্যক্রম থেকে আগাম ঝুঁকি কমানোর দিকে সবচেয়ে বেশি অগ্রসর হয়েছে। সিইইডব্লিউর জেলা পর্যায়ের গবেষণায় দেখা গেছে, ভারতের ৫৭ শতাংশ জেলা উচ্চ বা অতি উচ্চ তাপঝুঁকিতে রয়েছে, যেখানে দেশটির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মানুষ বসবাস করে। ভারতে ২৫০টির বেশি তাপপ্রবাহ মোকাবিলা কর্মপরিকল্পনা চালু আছে এবং তাপপ্রবাহকে সরকারিভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ১৮ হাজারের বেশি চিকিৎসা কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও, এই পরিকল্পনাগুলোকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার গণ্ডির বাইরে নিয়ে গিয়ে নির্দিষ্ট অর্থায়ন ও স্বাস্থ্য ফলাফল মূল্যায়নের ব্যবস্থা রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।

নেপাল, যা আগে মূলত বন্যা ও খরা মোকাবিলা করত, এখন চরম গরমের ঝুঁকিতে পড়েছে। ২০২৪ সালে দেশটির তরাই সমভূমিতে ৫০ দিন তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে ছিল। নেপাল প্রথম কেন্দ্রীয় তাপপ্রবাহ মোকাবিলা পরিকল্পনা প্রকাশ করলেও স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নিয়মিত তাপজনিত অসুস্থতার তথ্য সংরক্ষণ করা হয় না। তরাই অঞ্চলের হাসপাতালগুলোতে এই তথ্য নথিবদ্ধ করা বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করা হয়েছে।

ভুটানের দক্ষিণাঞ্চলীয় নিচু এলাকা এবং আগে শীতল থাকা উপত্যকাগুলোতেও তাপমাত্রা বাড়ছে। ভুটানের জাতীয় নীতিতে তাপ মোকাবিলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং ২০২২ সালের বিধিমালায় শ্রমিকদের সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। বন্যা ও হিমবাহ দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থাকে তাপের ক্ষেত্রেও সম্প্রসারণ করে একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে।

সিইইডব্লিউর ফেলো এবং জিএইচএইচআইএন দক্ষিণ এশিয়া হাবের চেয়ারম্যান বিশ্বাস চিতালে বলেন, চরম গরম এখন দক্ষিণ এশিয়ার সারা বছরের আঞ্চলিক ঝুঁকি। তবে এই ঝুঁকি মোকাবিলায় অঞ্চলটিকে একেবারে শুরু থেকে কাজ করতে হচ্ছে না। প্রতিটি দেশেই পাঁচ বছর আগের তুলনায় তাপ পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। তার মতে, এখন মূল কাজ হলো আবহাওয়ার পূর্বাভাসের সঙ্গে স্বাস্থ্যব্যবস্থা, স্থানীয় বাজেট এবং শ্রমবিধিকে যুক্ত করা, যাতে সতর্কবার্তা কার্যকর সুরক্ষায় পরিণত হয়।

ইউএনএসক্যাপের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি এবং দুর্যোগঝুঁকি হ্রাস বিভাগের পরিচালক কিয়ং কো বলেন, ‘তাপ সীমান্তে থেমে থাকে না। তাই এর মোকাবিলাও সীমান্তের মধ্যে আটকে থাকা উচিত নয়। দেশগুলো পূর্বাভাস বিনিময় করতে পারে, ব্যবস্থা নেওয়ার তাপমাত্রাসীমা সমন্বয় করতে পারে এবং আগে থেকে চালু দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মধ্যে তাপের ঝুঁকি যুক্ত করতে পারে।’

গ্লোবাল হিট ফোরামের পর দক্ষিণ এশিয়া হাব বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে একটি আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করবে। তাপের মৌসুমের আগে ও পরে চার দেশের সরকারের জন্য পরিস্থিতি মূল্যায়ন প্রস্তুত করা হবে, যাতে বৈজ্ঞানিক তথ্যকে সমন্বিত কার্যক্রমে রূপ দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়।