সেঁজুতি ইসলামের বয়স যখন মাত্র দুই বছর, তখনই এক সড়ক দুর্ঘটনায় পৃথিবী থেকে চলে যান তাঁর বাবা শহিদুল ইসলাম। বাবা পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডে কর্মরত ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর পরিবারটি প্রতি মাসে চার হাজার টাকা করে সহায়তা পেতে শুরু করে। তবে তিন সদস্যের একটি পরিবারের জীবনযাপনের জন্য এই সামান্য অর্থ যথেষ্ট ছিল না। চরম আর্থিক অনটনের মুখে পড়ে মা ফাতেমা খাতুন ভাড়া বাসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। দুই মেয়েকে নিয়ে তিনি আশ্রয় নেন এক ফুফুর বাসায়, যেখানে তাঁরা এখনো বসবাস করছেন।
প্রচণ্ড অভাব ও প্রতিকূলতার মাঝেও দুই মেয়ের পড়াশোনার ব্যাপারে আপসহীন ছিলেন ফাতেমা খাতুন। তাঁর বড় মেয়ে বর্তমানে স্নাতকে অধ্যয়নরত এবং ছোট মেয়ে সেঁজুতিও একই কলেজে ভর্তি হয়েছে। শুধু আর্থিক সংকট নয়, ফাতেমা খাতুন নিজেও গুরুতর অসুস্থ। প্রতি মাসে তাঁকে দুই ব্যাগ রক্ত নিতে হয়, যা একটি দাতব্য সংস্থার সহযোগিতায় তিনি পান। তবে সামনে আরও বড় সংকট; আগামী বছর থেকে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড থেকে প্রাপ্ত আর্থিক সহায়তা বন্ধ হয়ে যাবে। এখন দুই মেয়ের পড়াশোনা কীভাবে চলবে, তা নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন তিনি।
মেয়ে সেঁজুতির সঙ্গে শিখো-মুক্তকণ্ঠ জিপিএ-৫ কৃতী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এসে পরিবারের এই দীর্ঘ সংগ্রামের কথা আবেগঘন কণ্ঠে বর্ণনা করেন ফাতেমা খাতুন। আজ সোমবার সকালে নাটোর জেলা পরিষদ মিলনায়তনে এই বিশেষ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
মুক্তকণ্ঠের আয়োজনে এবং শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম শিখোর পৃষ্ঠপোষকতায় এই জিপিএ–৫ প্রাপ্ত কৃতী সংবর্ধনা কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। ‘স্বপ্ন দেখো জীবন গড়ো’ স্লোগানকে সামনে রেখে সারা দেশে ২০২৬ সালে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ–৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের জন্য ৬৪ জেলায় এই সংবর্ধনার আয়োজন করা হচ্ছে।
পুরো আয়োজনটি পাওয়ার্ড বাই বিকাশ এবং সহযোগিতায় পাশে থাকছে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা–গ্রি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও মুক্তকণ্ঠ বন্ধুসভা।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বাবা ইউসুফ আলীর সঙ্গে উপস্থিত হয়েছিলেন সদর উপজেলার ছাতনীভবানি গ্রামের ইভা খাতুন। ইভাদের বাবা ইউসুফ আলী জানান, তিনি আগে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। কিন্তু এক দুর্ঘটনায় তিনি শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়ে পড়েন। জীবনযুদ্ধের লড়াইয়ে তিনি এখন রিকশা চালিয়ে সংসার চালান। মেয়ের চোখে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখে তাকে পড়াশোনা করাচ্ছেন তিনি।
সেঁজুতি ও ইভাদের মতো অসংখ্য কৃতী শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে মুখর হয়ে উঠেছিল পুরো অনুষ্ঠানস্থল। সকাল ৮টা থেকেই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা ভিড় জমাতে শুরু করেন। সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে মূল অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। নাটোর বন্ধুসভার সভাপতি জমিন আহম্মেদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন মুক্তকণ্ঠের নাটোর প্রতিনিধি মুক্তার হোসেন।
অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে নবাব সিরাজ উদ দৌলা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মো. শফিক নেওয়াজ তালুকদার বলেন, “শুধু ডিগ্রি অর্জন করলেই হবে না, তা মানসম্মত হতে হবে। নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে।”
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য প্রদান করেন নাটোর সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ আবু হাসনাত মো. রফিকুল ইসলাম, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক অলোক কুমার মৈত্র, মুক্তকণ্ঠের রাজশাহীর নিজস্ব প্রতিবেদক আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ এবং নাটোরের লাঠি-বাঁশি সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আবদুস সালাম।
চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে সফলতার শিখরে পৌঁছানোর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে সদ্য স্নাতক শেষ করা রনি মোল্লা। এছাড়া অনুষ্ঠানে জেলায় মনোনীত গুণী শিক্ষক হিসেবে লালপুরের বড়বাদকয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সাইফুল ইসলামকে ফুল দিয়ে বিশেষ সম্মাননা জানানো হয়।