সূর্যাস্তের পড়ন্ত আলোর স্নিগ্ধতায় ঘেরা একটি ছবি। সেখানে হাসিমুখে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছেন গনসালো রামোস ও তাঁর স্ত্রী। তাঁদের কোলে নিশ্চিন্তে বসে আছে তাঁদের ফুটফুটে সন্তান। পারিবারিক এই মুহূর্তের ছবিটির কমেন্ট বক্স বা মন্তব্যের ঘরে প্রবেশ করলে যে কেউ বিভ্রান্ত হতে পারেন।

রামোসের সুখী পরিবারের প্রশংসা খুব সামান্যই সেখানে। বরং পুরো কমেন্ট সেকশন দখল করে নিয়েছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো! তবে সেখানে স্বয়ং রোনালদো নন, বরং তাঁর অন্ধ ভক্ত-সমর্থকেরা ভিড় জমিয়েছেন। কেউ রোনালদোর শ্রেষ্ঠত্বের জয়গান গাইছেন, কেউবা পোস্ট করছেন তাঁর গোল উদযাপনের ছবি। কিছু মন্তব্য কেবল রোনালদোকে টেনে আনাই নয়, বরং সরাসরি আক্রমণ করা হয়েছে গনসালো রামোসকেও।

ইনস্টাগ্রামের এই পোস্টটি রামোসের স্ত্রী মার্গারিদা ডমিঙ্গেজের। সাধারণত তাঁর পোস্টে খুব কম মন্তব্য হয়ে থাকে। কিন্তু ১ অক্টোবর স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে তোলা ছবিটি পোস্ট করার পর তিনি এক ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি হন—মন্তব্যের ঘরে যেন বয়ে যাচ্ছে ঝড়। হাজার হাজার মন্তব্য জমা হতে থাকে। পর্তুগিজ সংবাদমাধ্যম গ্লোরিওসো ১৯০৪-এর তথ্যমতে, প্রথম দুই দিনেই রামোস পরিবারের এই ছবিটিতে তিন হাজারের বেশি মন্তব্য পড়েছে, যার অধিকাংশ ছিল নেতিবাচক।

রামোসের ব্যক্তিগত পরিসরে এমন ‘রোনালদো-ঝড়’ বয়ে যাওয়ার কারণ খুব একটা জটিল নয়। যে দিন ছবিটি প্রকাশিত হয়, সেদিনই কোপেনহেগেনে পর্তুগাল দলের ক্যাম্প ছেড়ে চলে যান রোনালদো। নতুন কোচ জর্জ জেসুস প্রথম ম্যাচে ওয়েলসের বিপক্ষে রোনালদোকে একাদশে রাখলেও নরওয়ের বিপক্ষে পরের ম্যাচে তাঁকে সুযোগ দেননি। শুধু একাদশই নয়, বদলি হিসেবেও নামাননি তাঁকে। যদিও দ্বিতীয়ার্ধে কিছুটা সময় তাঁকে ওয়ার্মআপ করানো হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুরো ৯০ মিনিট মাঠের বাইরেই কাটাতে হয় রোনালদোকে। রেকর্ডভরা ক্যারিয়ারের অধিকারী এই তারকার নাম লিখে একাদশে বাকিদের নাম সাজাতেন কোচরা। অথচ এমন এক পরিস্থিতি এলো যে, এক মিনিটও মাঠে নামার সুযোগ পেলেন না তিনি। প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে রোনালদোর জন্য ২০০৮ সালের পর এটিই প্রথম এমন তিক্ত অভিজ্ঞতা।

ম্যাচ শেষে সাংবাদিকরা এই বিষয়ে জানতে চাইলে পর্তুগাল কোচ জানান, রোনালদোকে মাঠে নামানোর মতো প্রয়োজন তিনি অনুভব করেননি। তাঁর মতে, রামোস শুরু থেকেই দারুণ খেলছিলেন, তাই তাঁকেই মাঠে রাখা তাঁর সিদ্ধান্ত ছিল। আল নাসরের সাবেক কোচ জেসুসের ওপর রোনালদোর ক্ষোভের সূত্রপাত ঠিক এখান থেকেই।

নরওয়ে থেকে পর্তুগাল দল ডেনমার্কে যায়। সেখানে ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে জেসুস স্পষ্ট করে দেন যে, এবারও একাদশে জায়গা হচ্ছে না রোনালদোর। আর তখনই ঘটে ক্ষোভের বিস্ফোরণ। ২৪ ঘণ্টা পর ম্যাচ থাকলেও ৪১ বছর বয়সী এই পর্তুগিজ তারকা কোপেনহেগেনের ক্যাম্প ছেড়ে চলে যান।

রোনালদোর দল ছেড়ে যাওয়ার পেছনে রামোসের কোনো দায় নেই; তাঁর ক্ষোভ ছিল কোচের প্রতি। কিন্তু যেহেতু রামোসই রোনালদোর জায়গায় খেলছেন, তাই কিছু অন্ধ সমর্থকের চোখে তিনি হয়ে ওঠেন সেই ক্ষোভের লক্ষ্যবস্তু। ২৫ বছর বয়সী রামোসের জন্য তৈরি হয় এক অদ্ভুত মানসিক সমীকরণ। তিনি রোনালদো নন এবং তাঁর হওয়ার কথা নয়। কিন্তু পর্তুগালের কোচ যখন রোনালদোকে বেঞ্চে বসিয়ে তাঁকেই বেছে নিচ্ছেন, তখন অনিবার্যভাবেই তাঁকে তুলনার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে।

গোলমুখে তাঁর সামনে থাকে প্রতিপক্ষের গোলকিপার এবং চারপাশে ডিফেন্ডার। কিন্তু মাঠের বাইরেও তাঁকে সামলাতে হচ্ছে আরেক প্রতিপক্ষকে—অলক্ষ্যে তাঁকে ঢেকে রাখা রোনালদোর বিশাল ছায়া।

রামোসের জন্য এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া এবারই প্রথম নয়। ২০২২ বিশ্বকাপেও সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে রোনালদোকে বসিয়ে ফার্নান্দো সান্তোস রামোসকে ফরোয়ার্ডে খেলিয়েছিলেন। সেই শেষ ষোলোর ম্যাচে ২১ বছর বয়সী রামোস হ্যাটট্রিক করেন। মূলত আলোচনাটা শুরু হয়েছিল তখন থেকেই।

অনেকে মনে করেন, রোনালদোর উপস্থিতির কারণেই পর্তুগাল রামোসকে ঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারছে না। আবার এক অংশ পর্তুগাল দলে রোনালদোর কোনো বিকল্পই দেখতে চায় না; তাঁদের চোখে রোনালদোর বদলে খেলা রামোস একজন ‘সুবিধাপ্রাপ্ত’ খেলোয়াড়। কাতার বিশ্বকাপের পর পর্তুগালের কোচ ছিলেন রবার্তো মার্তিনেজ। এই স্প্যানিশ কোচ অনেকটা দ্বিতীয় দলের মতো ছিলেন। জেসুস আসার আগ পর্যন্ত মার্তিনেজের সাড়ে তিন বছরে মাত্র ২৩ ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছেন রামোস। ২০২৬ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বেও পর্তুগালের পাঁচ ম্যাচের মাত্র দুটিতে সুযোগ মিলেছে তাঁর, তাও বদলি হিসেবে সাকল্যে ৩৪ মিনিট।

নতুন কোচ জেসুসের আগমনে রামোস নতুন অধ্যায়ের আশা করেছিলেন। নরওয়ের বিপক্ষে একাদশে জায়গা পাওয়া সেই আশারই প্রতিফলন ছিল। কিন্তু সেই ম্যাচ থেকেই শুরু হলো নতুন ঝড়। রোনালদোর অনুপস্থিতি, রামোসের দুর্দান্ত খেলা এবং কোচের পূর্ণ আস্থা—সব মিলিয়ে তৈরি হলো এক নতুন বাস্তবতা। যার ফলে রোনালদো দল ছাড়লেন এবং তাঁর স্ত্রীর দেওয়া পারিবারিক ছবির পোস্টে ঝাঁপিয়ে পড়লেন হাজারো মানুষ।

এমন কঠিন পরিস্থিতিতে রামোসের জন্য মাঠে নিজেকে প্রমাণ করা আরও জরুরি হয়ে পড়েছিল। আর সেটাই তিনি করে দেখিয়েছেন। রোনালদোর বেঞ্চে বসে থাকা সেই ম্যাচে গোল করেছিলেন তিনি। ডেনমার্কের বিপক্ষে পর্তুগালের ৪–১ জয়ের ম্যাচেও গোল করেন তিনি। সেদিনই সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে অনেকটা ঘোষণার সুরে বলেছিলেন, ‘আমি নিজেকে নিজের জায়গায় প্রমাণ করেছি।’

সেই প্রমাণের আরেকটি ছাপ রেখে গেছেন গতকাল রাতেও। নরওয়ের বিপক্ষে ফিরতি ম্যাচে পর্তুগালের ২–১ ব্যবধানের জয়সূচক গোলটি ছিল তাঁরই। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো টানা তিন ম্যাচে গোল করলেন রামোস।

রামোস হয়তো জানেন, এই গোলের পর এবং রোনালদোর সঙ্গে তাঁর তুলনা এখনই থামবে না। রোনালদো ফিরলে আবারও হয়তো জায়গা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে, আবারও তাঁকে দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকতে হবে। কিন্তু আপাতত যে সুযোগটি তিনি পেয়েছেন, সেখানে দাঁড়িয়ে তিনি নিজের মতো করেই উত্তর দিচ্ছেন—গোলে গোলে।