দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ, বিশেষায়িত, জেনারেল, জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোর স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মোট ৫৪ জন কর্মকর্তাকে এই বিশেষ তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। জনসেবার গুণগত মান নিশ্চিত করতে তারা নিয়মিত বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিদর্শন ও মনিটরিং করবেন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের প্রশাসন-১ শাখা থেকে গত ৩০ সেপ্টেম্বর এক অফিস আদেশের মাধ্যমে এই নির্দেশনা জারি করা হয়।

সংশ্লিষ্ট আদেশ অনুযায়ী, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব এবং উপসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট হাসপাতাল এবং বিভিন্ন জেলা ও বিভাগের স্বাস্থ্যকেন্দ্র তদারকির দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। বিশেষ ক্ষেত্রে কিছু কর্মকর্তাকে একটি জেলার পাশাপাশি অন্য জেলার হাসপাতালের অতিরিক্ত দায়িত্বও প্রদান করা হয়েছে।

আদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা তাদের আওতাধীন জেলা, উপজেলা ও হাসপাতালের জনবল, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, চিকিৎসা সরঞ্জাম, অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপত্তা এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল প্রধানের সঙ্গে সমন্বয় করে স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবেন।

হাসপাতালগুলোর চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ডিজিটাল হাজিরা নিয়মিত তদারকি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাদের। এছাড়া উপস্থিতি সংক্রান্ত তথ্য ও প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করতে হবে এই কর্মকর্তাদের।

টিকাদান কর্মসূচি, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের অগ্রগতি নিশ্চিত করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে বলা হয়েছে।

এর পাশাপাশি মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, প্রবীণ স্বাস্থ্যসেবা ও পুষ্টি কার্যক্রমসহ জনস্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে অংশগ্রহণ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে উদ্ভাবনী ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহিত করতে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করতে হবে তাদের।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিয়মিত জেলা, উপজেলা ও হাসপাতাল পরিদর্শন করতে হবে। পরিদর্শনের সময় যেসব সমস্যা পাওয়া যাবে, সেই পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রতিটি পরিদর্শনের পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশের ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে প্রতি মাসের ৭ তারিখের মধ্যে নির্ধারিত শাখায় পাঠাতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যেক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে প্রতি মাসে কমপক্ষে একটি পরিদর্শন সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।

অফিস আদেশের তালিকায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রশাসন, উন্নয়ন, বিশ্বস্বাস্থ্য, হাসপাতাল, জনস্বাস্থ্য, আর্থিক ও অডিট, বাজেট ও নার্সিংসহ বিভিন্ন শাখার কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় হাসপাতাল ও বিভাগভিত্তিক তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালসহ গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতাল ও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক তদারক কর্মকর্তা নির্ধারণ করা হয়েছে।

যুগ্ম সচিব ও উপসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দেশের বিভিন্ন জেলার হাসপাতালগুলোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাদের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে জেলা পর্যায়ের হাসপাতালের পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালও তদারকি করা।

আদেশ অনুযায়ী, কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্য প্রশাসন ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। পরিদর্শনের মাধ্যমে হাসপাতালের বিদ্যমান সমস্যা চিহ্নিত করে তা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া এবং স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করাই এই ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ আদেশে জানিয়েছে, নির্ধারিত দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়মিত দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে পালন করতে হবে। আদেশটি জারির তারিখ থেকেই কার্যকর করা হয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের এই উদ্যোগের ফলে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের কর্মকর্তারা সরাসরি হাসপাতাল পরিদর্শনের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবার বাস্তব চিত্র, জনবল উপস্থিতি, চিকিৎসা সরঞ্জামের ব্যবহার, অবকাঠামোগত সমস্যা ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে পরিদর্শন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পথও সুগম হবে বলে আশা করা হচ্ছে।