মুঠোফোনে পাঠানো খুদে বার্তার মাধ্যমে যক্ষ্মারোগীদের ধূমপান ছাড়তে কার্যকর সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে। একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিতভাবে মুঠোফোনে বার্তা পাওয়ার ফলে প্রায় ৪২ শতাংশ যক্ষ্মারোগী ধূমপান ত্যাগ করেছেন। এই ইতিবাচক ফলাফলের প্রেক্ষিতে সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখন থেকে ধূমপান প্রতিরোধ কার্যক্রমকে সরাসরি যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সঙ্গে একীভূত করা হবে।

রাজধানীর একটি হোটেলে আজ বৃহস্পতিবার ‘কুইট ফর টিবি ট্রায়াল’ শীর্ষক গবেষণাটির ফলাফল প্রকাশ করা হয়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আর্ক ফাউন্ডেশনের আয়োজনে এই অনুষ্ঠানে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, দেশি-বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, জনস্বাস্থ্যবিদ, গবেষক এবং তামাকবিরোধী সংগঠনের প্রতিনিধি ও এনজিও কর্মীগণ উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশের আর্ক ফাউন্ডেশন এবং পাকিস্তানের ইসলামাবাদের দ্য ইনিশিয়েটিভ যৌথভাবে যক্ষ্মারোগীদের ধূমপানমুক্ত করতে এই গবেষণাটি পরিচালনা করে। এই প্রক্রিয়ায় যুক্তরাজ্যের বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ও সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিল। অনুষ্ঠানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে জানানো হয়, ধূমপান যক্ষ্মার ঝুঁকি যেমন বাড়িয়ে দেয়, তেমনি এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সম্ভাবনাও বৃদ্ধি করে। তবে ধূমপান ছেড়ে দিলে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হওয়ার এবং মৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।

গবেষণার পদ্ধতি ও প্রাপ্ত ফলাফল

যুক্তরাজ্যের ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক কামরান সিদ্দিকি অনুষ্ঠানে গবেষণার বিস্তারিত ফলাফল উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, গবেষণাটি দুটি পৃথক পর্যায়ে সম্পন্ন করা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে দুই দেশের ২৭টি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের ১ হাজার ৮০ জন যক্ষ্মারোগীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাঁদের একটি নির্দিষ্ট অংশকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত ১৩৪টি বার্তা ছয় মাস ধরে মুঠোফোনে পাঠানো হয়, আর অন্য অংশকে কোনো বার্তা দেওয়া হয়নি। ছয় মাস পর দেখা যায়, মুঠোফোনে বার্তা পাওয়া রোগীদের মধ্যে ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ ধূমপান ছেড়ে দিয়েছেন, যেখানে বার্তা না পাওয়াদের মধ্যে এই হার ছিল মাত্র ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ।

দ্বিতীয় পর্যায়ে ৩৬টি প্রতিষ্ঠানের ১ হাজার ৭৬৪ জন যক্ষ্মারোগীকে নিয়ে গবেষণা চালানো হয়। তাঁদের সমান দুটি দলে ভাগ করা হয়েছিল। একদলকে মুঠোফোনে খুদে বার্তা দেওয়া হয় এবং অন্য দলকে স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে সরাসরি মুখোমুখি বসে পরামর্শ দেওয়া হয়। ফলাফলে দেখা যায়, মুখোমুখি পরামর্শ পাওয়া রোগীদের মধ্যে ধূমপান ছাড়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি ছিল; এই দলের ৬২ দশমিক ১ শতাংশ ধূমপান ছেড়ে দেন। অন্যদিকে, মুঠোফোনে বার্তা পাওয়া রোগীদের মধ্যে এই হার ছিল ৩৫ দশমিক ৯ শতাংশ।

কামরান সিদ্দিকি বলেন, “মুঠোফোনে পাঠানো বার্তাগুলো ছিল যক্ষ্মা বা যক্ষ্মার বিপদবিষয়ক। আর বাংলাদেশে এসব বার্তা ছিল বাংলা ভাষায়।”

গবেষণার প্রথম পর্যায়টি ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারির মধ্যে এবং দ্বিতীয় পর্যায়টি ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিলের মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।

সরকারি পদক্ষেপ ও চ্যালেঞ্জ

আলোচনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনি জানান, দেশে প্রতিদিন ধূমপানের কারণে প্রায় সাড়ে ৫০০ এবং যক্ষ্মার কারণে ১২৬ জনের মৃত্যু ঘটে। তিনি উল্লেখ করেন, অর্থের অভাব না থাকলেও দেশে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি বাস্তবায়নে কিছু সমস্যা রয়েছে, যার মধ্যে পরিকল্পনার অভাব এবং জনবলের সংকট অন্যতম। মাঠপর্যায়ের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, অনেক রোগী নিয়মিতভাবে যক্ষ্মার ওষুধ সেবন করছেন না।

জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল ও যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির কর্মকর্তারা জানান, জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় এখন থেকে ধূমপান প্রতিরোধের বিষয়টি যুক্ত করা হচ্ছে। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের অধ্যাপক আতিকুল হক বলেন, বাংলাদেশের প্রায় ৭০ শতাংশ ধূমপায়ী ধূমপান ছাড়তে আগ্রহী। তবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও সংগঠনের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। এছাড়া মানুষকে ধূমপান ছাড়তে উদ্বুদ্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষিত জনবলেরও ঘাটতি রয়েছে।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ও আর্ক ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অধ্যাপক রুমানা হক বলেন, “তামাক নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়কে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।”