লিখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. শরিফুল আলম খন্দকার
বর্তমান বিশ্বের অর্থনীতিতে যে খাতগুলো সবচেয়ে দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং যেগুলোর ভবিষ্যৎ অত্যন্ত সম্ভাবনাময়, তার মধ্যে পর্যটন ও আতিথেয়তা বা ‘ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি’ অন্যতম। এখন আর এই খাতটি কেবল বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি হয়ে উঠেছে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের এক শক্তিশালী চালিকাশক্তি। বিশ্বজুড়ে এই খাতের পরিধি ক্রমাগত বিস্তৃত হচ্ছে এবং এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৩০০টি ভিন্ন ভিন্ন খাত যুক্ত হয়ে একটি বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রথাগত হোটেল, রিসোর্ট কিংবা ট্রাভেল এজেন্সির বাইরেও আধুনিক খাদ্যশিল্প, ক্যাটারিং সেবা, ইভেন্ট ও কনফারেন্স ম্যানেজমেন্ট এবং বিশেষ করে দ্রুত বর্ধনশীল এভিয়েশন বা এয়ারলাইনস ইন্ডাস্ট্রিতে এই বিষয়ের স্নাতকদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আশার কথা এই যে, অনেক শিক্ষার্থী অন্য কোনো বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি শেষ করার পর এই খাতের বৈচিত্র্যময় কাজের সুযোগ ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে এখানে ক্যারিয়ার গড়ছেন। উল্লেখ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৭ সালে প্রথম এই বিষয়ে বিশেষায়িত বিবিএ প্রোগ্রাম শুরু হয়।
বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল এবং এখানে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সম্ভাবনার পথ উন্মোচিত হচ্ছে। বিশেষ করে ‘ব্লু ইকোনমি’ বা সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতির ধারণাটি বর্তমানে দেশে জনপ্রিয় ও সুপ্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। আমাদের বিশাল সমুদ্রসীমা ও প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ, সামুদ্রিক খনিজ সম্পদ উত্তোলন এবং পরিবেশবান্ধব বিচ ট্যুরিজম বা সমুদ্রনির্ভর পর্যটনের ব্যাপক প্রসার ঘটবে। এই বিশাল খাতগুলোর সঠিক ব্যবস্থাপনা ও দক্ষ পরিচালনার জন্য প্রয়োজন হবে বিপুল সংখ্যক প্রশিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদ। এর পাশাপাশি স্থানীয় সংস্কৃতি, জীবনযাত্রা এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে গড়ে ওঠা ‘কমিউনিটি বেজড ট্যুরিজম’ বা সম্প্রদায়ভিত্তিক পর্যটনের প্রসার ঘটছে, যা একদিকে যেমন তৃণমূল পর্যায়ের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে, অন্যদিকে পর্যটন খাতে নতুন মাত্রা যোগ করছে। তাই দেশীয় পর্যটন খাতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে এবং ব্লু ইকোনমির পূর্ণ সুবিধা গ্রহণ করতে ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টের শিক্ষার্থীদের ভূমিকা হবে অপরিসীম।
প্রযুক্তির বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ফলে এই খাতেও এসেছে আমূল রূপান্তর। বর্তমানে ট্যুরিজম ও হসপিটালিটি সেক্টরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, অনলাইন বুকিং সিস্টেম, ডেটা অ্যানালিটিকস এবং ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মতো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যাপক সমন্বয় ঘটছে। এর ফলে সেবার মান যেমন উন্নত হয়েছে, তেমনি ব্যবস্থাপনায় এসেছে আধুনিকতা। তবে এই প্রযুক্তিগত রূপান্তরকে সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে বিশেষায়িত জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ জনবলের প্রয়োজন। প্রথাগত ধারণার বাইরে গিয়ে প্রযুক্তি ও পর্যটনের এই মেলবন্ধনে যে দক্ষতার ঘাটতি বা ‘স্কিল গ্যাপ’ তৈরি হয়েছে, তা পূরণে প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রিধারী এবং প্রযুক্তিতে দক্ষ তরুণদের চাহিদা এখন সবচেয়ে বেশি। এটি শিক্ষার্থীদের জন্য কেবল প্রচলিত চাকরির সুযোগই নয়, বরং নতুন নতুন টেক-ভিত্তিক পর্যটন স্টার্টআপ বা উদ্যোগ গড়ে তোলার এক দারুণ সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে।
শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ বাজারেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এই বিষয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে অপার সম্ভাবনা। বিশ্বমানের সার্ভিস ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে সব সময় দক্ষতার মূল্যায়ন করা হয়। প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে প্রচুর দক্ষ ও পেশাদার কর্মী বিদেশের নামী হোটেল চেইন, এয়ারলাইনস, ক্রুজ শিপ এবং আন্তর্জাতিক ট্রাভেল সংস্থায় নিযুক্ত হচ্ছেন। স্নাতক বা স্নাতকোত্তর শেষ করে শিক্ষার্থীরা ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং এশিয়ার উন্নত দেশগুলোর স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাচ্ছেন। গ্লোবাল হসপিটালিটি ট্রেন্ডস, সাসটেইনেবল ট্যুরিজম, ডেস্টিনেশন ডেভেলপমেন্ট এবং ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে গবেষণার বিস্তৃত সুযোগ রয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়তা করে।
পর্যটন ও আতিথেয়তা খাত কেবল একটি নির্দিষ্ট পেশার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি বহুমাত্রিক ও বৈশ্বিক ক্ষেত্র। এখানে পেশাগত কাজের পাশাপাশি গবেষণা, শিক্ষকতা, উদ্যোক্তা হওয়া এবং আন্তর্জাতিক সংস্থায় নেতৃত্ব দেওয়ার অনন্য সুযোগ রয়েছে। স্থানীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহার, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং ব্লু ইকোনমির মতো উদীয়মান ক্ষেত্রগুলোকে কাজে লাগাতে পারলে এই খাতের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। যারা প্রথাগত ক্যারিয়ারের বাইরে গিয়ে গতিশীল, রোমাঞ্চকর এবং বহুমুখী বৈশ্বিক সুযোগে ভরপুর একটি ভবিষ্যৎ গড়তে চান, তাঁদের জন্য ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট নিঃসন্দেহে একটি অত্যন্ত দূরদর্শী ও সময়োপযোগী পছন্দ।