প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তাঁর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্‌দী আমিনের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হয়েছেন নেদারল্যান্ডস সরকারের আন্তর্জাতিক সহযোগিতাবিষয়ক ভাইস মিনিস্টার এইচ ই স্টিভেন কোলেট। সোমবার (১২ অক্টোবর) বিকেলে তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, খাল খনন এবং ব্লু ইকোনমি বা নীল অর্থনীতি নিয়ে নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

দীর্ঘ বিরতির পর জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত একটি গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে এবং বর্তমানে দেশে সার্বিক সংস্কার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বৈঠকে এই বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। বাংলাদেশ পুনরায় গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসায় নেদারল্যান্ডসের পক্ষ থেকে আন্তরিক শুভকামনা জানানো হয়।

বৈঠকের আলোচনায় দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করা এবং বাংলাদেশে ডাচ বিনিয়োগের পরিধি সম্প্রসারণের বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়। উল্লেখ করা হয় যে, নেদারল্যান্ডসের অনেক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বাংলাদেশে সফলভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আরও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা প্রদানের বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পায়। এছাড়া কৃষি, টেক্সটাইল, মানবসম্পদের দক্ষতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা, সামগ্রিক অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের সম্ভাবনা নিয়ে আলাপ-আলোচনা হয়। এই সময়ে আলোচনায় উঠে আসে যে, নেদারল্যান্ডস নিয়মিতভাবে বাংলাদেশ থেকে সুস্বাদু আম আমদানি করে থাকে এবং বাংলাদেশে স্থানীয় পর্যায়ে নেদারল্যান্ডসের উন্নত জাতের আলু বীজ সফলভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

একই সঙ্গে ব্লু ইকোনমি ও জাহাজ নির্মাণ শিল্পে যৌথ অংশীদারত্বের ভিত্তিতে কাজ করার সুযোগ এবং ডাচ প্রতিষ্ঠানগুলোর কারখানায় বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা নিয়ে উভয় পক্ষ বিস্তারিত কথা বলেন।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের উন্নয়ন রূপকল্প, জনকল্যাণমুখী নীতি ও বিভিন্ন উদ্যোগ সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন। বিশেষ করে নদী ও খাল সংস্কারের অংশ হিসেবে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখনন প্রকল্প, তিস্তা ব্যারেজ এবং পদ্মা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে নেদারল্যান্ডসের আধুনিক প্রযুক্তি ও বিশেষজ্ঞ দক্ষতার পারস্পরিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়।

শিক্ষা ও কর্মসংস্থান খাতের আমূল রূপান্তরে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম প্রণয়ন, শিল্প ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক সমন্বয়, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার এবং আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক উভয় খাতের শ্রমিকদের দক্ষতা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি সরকারের বহুভাষিক শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় তৃতীয় ভাষা হিসেবে ডাচ ভাষা অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগসহ সরকারের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।

পরিবেশ সুরক্ষা ও জ্বালানি রূপান্তরের ক্ষেত্রে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ, পরিবেশবান্ধব শিল্প কারখানা স্থাপন এবং আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর জাতীয় মহাপরিকল্পনার কথা জানানো হয়। এ ছাড়া প্রান্তিক মানুষের সামাজিক সুরক্ষায় গৃহীত জনকল্যাণমুখী নীতি, যেমন নারীদের ক্ষমতায়নে ফ্যামিলি কার্ড এবং কৃষকদের সুরক্ষা নিশ্চিতে কৃষক কার্ড চালুর যুগান্তকারী পদক্ষেপগুলো ডাচ প্রতিনিধিদলকে অবহিত করা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা আরও তুলে ধরেন, বর্তমান সরকার দেশে পূর্ণাঙ্গ গণতন্ত্র, বাক্‌স্বাধীনতা ও মানবাধিকার সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে। একটি অত্যন্ত চমৎকার ও প্রাণবন্ত সংসদ পরিচালনা, সংসদে বিরোধী দলের জন্য অবাধ মত প্রকাশের পরিবেশ নিশ্চিতকরণ, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা ও কার্যকর স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা, বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রক্রিয়ার দ্রুত অগ্রগতি এবং জবাবদিহিতা বাড়াতে বিভিন্ন সংসদীয় কমিটি গঠনের বিষয়গুলোও বৈঠকে বিস্তারিত আলোচিত হয়।

বৈঠকে নেদারল্যান্ডসের প্রতিনিধিদলে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত এইচ.ই. জোরিস ভ্যান বোমেল এবং দেশটির টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক রাষ্ট্রদূত এইচ.ই. ওয়াম্পি লিবন।