‘ভাটির বাঘ’ ও ‘প্রজাদরদি রাজা’—এমন বহু উপনামে ভূষিত শমসের গাজী ছিলেন একজন শাসক এবং বিপ্লবী। উপমহাদেশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে তিনিই প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন বলে কথিত আছে। তবে তার স্মৃতিবিজড়িত নিদর্শনগুলো এখন পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বিস্মৃত হতে চলেছে এই কিংবদন্তি।
ইতিহাস অনুযায়ী, বর্তমান ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন শমসের গাজী। তাঁর পিতার নাম পীর মুহাম্মদ (মতান্তরে পেয়ার মুহাম্মদ খান) এবং মাতার নাম কৈয়্যারা বিবি। প্রারম্ভিক জীবনে তিনি এক জমিদারের ক্রীতদাস ছিলেন। কিন্তু নিজের জ্ঞান, শক্তি, দক্ষতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি নিজেই জমিদারে পরিণত হন। আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে নোয়াখালী, ফেনী, কুমিল্লা ও ত্রিপুরা অঞ্চলের ‘মুকুটহীন সম্রাট’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন শমসের গাজী। শোষক জমিদার এবং মগ-পর্তুগিজ জলদস্যুদের হাত থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করা তাঁর প্রধান লক্ষ্য ছিল। বিশাল লাঠিয়াল ও শক্তিশালী বাহিনী গড়ে তুলে তিনি টানা এক যুগ ধরে ত্রিপুরা রাজ্য শাসন করেন।
ইংরেজ বেনিয়াদেরও কোণঠাসা করে দিয়েছিলেন এই বীর। ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির আগ্রাসন প্রতিহত করার চেষ্টা করেন তিনি। তবে পরবর্তীতে ১৭৬০ সালে ব্রিটিশ ও তাদের সহযোগীদের চক্রান্তের শিকার হয়ে শহীদ হন শমসের গাজী।
ছাগলনাইয়া উপজেলার চম্পকনগরে রঘুনন্দন পাহাড়ের পাদদেশে শমসের গাজী তাঁর রাজধানী, কেল্লা ও রাজপ্রাসাদ স্থাপন করেন। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত ঘেঁষা চম্পকনগর ও জগন্নাথ সোনাপুর গ্রামে তাঁর ঐতিহাসিক সুড়ঙ্গ পথ, ‘খুইল্লার দিঘি’ (কৈয়ার দিঘি) এবং রাজপ্রাসাদের কেল্লার ভিটা আজও টিকে আছে। স্থানীয় তথ্যমতে, প্রাসাদসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ এখন ভারতের ত্রিপুরার মধ্যে বিভক্ত হয়ে গেছে।
অবিভক্ত বাংলাকালীন নির্মিত শমসের গাজীর সুড়ঙ্গটির বর্তমানে দুই দেশে দুটি মুখ রয়েছে—একটি বাংলাদেশে এবং অন্যটি ভারতে। এই সুড়ঙ্গ নিয়ে অনেক গল্প ও উপাখ্যান প্রচলিত আছে। জনশ্রুতি অনুযায়ী, গাজীর পরিবারের নারী সদস্যরা এই পথ দিয়ে গোসলে যেতেন। সুড়ঙ্গের অদূরে চার দশমিক ৩৬ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত শমসের গাজীর দিঘী অবস্থিত, যা ‘এক খুইল্লা দিঘী’ নামেও পরিচিত।
শমসের গাজীর স্মৃতি ধরে রাখতে ব্যক্তি উদ্যোগে নির্মিত স্থাপনার মধ্যে অন্যতম হলো ‘বাঁশের কেল্লা রিসোর্ট’। নবাবের স্মৃতি ধরে রাখতে তাঁর বংশধর, পার্বত্য উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমান খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঞাঁ পাঁচ একর জায়গায় এই রিসোর্টটি তৈরি করেন। রিসোর্টের প্রতিটি আসবাবপত্র ও কাঠামো বাঁশের নান্দনিক নির্মাণশৈলীতে তৈরি। এখানে ফল-ফুলের বাগান এবং খাগড়াছড়ির ঐতিহ্যবাহী পাহাড়ি ঘরের নমুনা রয়েছে, যা দেখতে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা ছুটে আসেন।
স্থানীয়দের দাবি, শমসের গাজীর ঐতিহাসিক সুড়ঙ্গ, দিঘি ও কেল্লার ভিটা সরকারিভাবে পূর্ণাঙ্গ সংস্কার ও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর বীরত্বগাথা পৌঁছে দিতে স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া এবং পাঠ্যবইয়ে তাঁর ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সীমান্তঘেঁষা এই এলাকাটিকে একটি নিরাপদ ও দৃষ্টিনন্দন ঐতিহাসিক পর্যটন জোন হিসেবে ঘোষণা করে নিরাপত্তা জোরদার করারও দাবি জানান বাসিন্দারা।
আবদুল কাদের জিলানী নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, "রহস্যময় সুড়ঙ্গ দেখতে প্রতিনিয়ত দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ ভিড় করছেন। শমসের গাজীর বীরত্বের ইতিহাস নিয়ে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা উচিত। সুড়ঙ্গসহ স্থাপনাগুলো রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। যেন অনাগত প্রজন্ম ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারে।"
ঐতিহ্য গবেষক ও ফেনী জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলাল বলেন, "বিপ্লবী শমসের গাজী আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার বীরত্ব ও দেশপ্রেম যুগ-যুগ ধরে প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। অনেকে ফেনীর এই সাহসী সন্তানকে ভুলতে বসেছে, যা জাতির বড় ব্যর্থতা। আমি সরকারের কাছে জোর দাবি জানাব, যেন শমসের গাজীর ইতিহাস পাঠ্য বইতে সংযুক্ত করা হয়, যা তরুণদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করবে।"
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফেনীর জেলা প্রশাসক (ডিসি) মনিরা হক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "শমসের গাজীর ইতিহাস আমাদের অমূল্য সম্পদ। তার রেখে যাওয়া ইতিহাস ও স্থাপনা রক্ষা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দিতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, সে বিষয়ে দ্রুত খোঁজ-খবর নেওয়া হবে।"