দেশে উচ্চশিক্ষার বিস্তারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা অপরিসীম। শিক্ষার মানের দিক থেকে দেশের শীর্ষস্থানীয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে আছে বেসরকারি খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। তবে গত আড়াই দশকে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থে একের পর এক অনুমোদন দেওয়ার ফলে শিক্ষার মানের সাথে বড় ধরনের আপস করতে হয়েছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অবকাঠামোর অভাব রয়েছে, আবার পরিচালনার জন্য আবশ্যকীয় পদেও লোকবল নেই। এমন নামমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ন্যূনতম মান নিশ্চিত করতে না পারলে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়ছে।
মুক্তকণ্ঠের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য চিন্তার বিষয়। দেশে বর্তমানে ১১৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নেই, ৮৯টিতে সহ-উপাচার্য নেই এবং ৪০টিতে কোষাধ্যক্ষ নেই। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ১৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য, সহ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ—এই তিন শীর্ষ পদই শূন্য রয়েছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে এই নেতৃত্বশূন্য অবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে, তা বোধগম্য নয়। মুক্তকণ্ঠের এক প্রতিবেদক ঠিকানাভুক্ত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনে গিয়ে দেখেন, ছয়তলা পর্যন্ত ফার্নিচারের দোকান সাজানো থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়টির কার্যক্রম চলছে সাততলায়।
একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় শীর্ষ পদগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন এই পদগুলো শূন্য থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, একাডেমিক পরিকল্পনা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বর্তমানে প্রশাসনিক নেতৃত্বে শূন্য পদ পূরণের জন্য ৩৫১ জন অধ্যাপকের প্রয়োজন। যোগ্য ও অভিজ্ঞ অধ্যাপক পাওয়া কঠিন হলেও নিয়োগপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং পছন্দের ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার প্রবণতা সমস্যাকে আরও জটিল করছে। এতে প্রশ্ন জাগে, দেশে এতগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন আদৌ আছে কি না।
অনেক ক্ষেত্রে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মানেই ছিল ভাড়া করা ভবন। পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, ল্যাবরেটরি, গ্রন্থাগার ও সহশিক্ষা কার্যক্রম ছাড়াই অনেক প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়েছে। আইন অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠার সময় থেকে ১২ বছরের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম স্থানান্তর করতে হয়। এ পর্যন্ত ৫৪টি বিশ্ববিদ্যালয় এই শর্ত মেনে নিজস্ব ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠা করলেও ২৮টি বিশ্ববিদ্যালয় নির্ধারিত সময়ের পরও তা করেনি, যা সুস্পষ্টভাবে আইনের লঙ্ঘন।
সাড়ে তিন লাখের বেশি শিক্ষার্থী বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছেন। অভিভাবকরা কয়েক লাখ টাকা বিনিয়োগ করে সন্তানদের মানসম্মত উচ্চশিক্ষা দিতে চান, যাতে তারা কর্মবাজারের জন্য দক্ষ হয়ে ওঠে। কিন্তু যেখানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, শিক্ষক ও প্রশাসনিক নেতৃত্বের অভাব, সেখানে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ালেই উচ্চশিক্ষার বিস্তার ঘটবে না; বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার মান বজায় রাখাই সরকারের প্রধান দায়িত্ব। যেসব বিশ্ববিদ্যালয় আইনগত ও একাডেমিক শর্ত পূরণ করছে না, তাদের বিরুদ্ধে ইউজিসিকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। শীর্ষ পদগুলো দ্রুত পূরণের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও স্বচ্ছতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো ধরনের আপস করার সুযোগ নেই।