সমুদ্র, নদী-নালা, খাল-বিল ও বনভূমির সমাহারে গড়ে উঠেছে বরিশাল। ইতিহাস ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এই দক্ষিণাঞ্চল শরতের মৌসুম ছাড়াও বছরের যেকোনো সময়ে ভ্রমণের আদর্শ গন্তব্য হতে পারে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর ভোলা ছাড়া বরিশাল বিভাগের অন্যান্য জেলায় সড়কপথে দ্রুত যাওয়া সম্ভব হয়েছে। তবে নদীনির্ভর এই অঞ্চলের নৌপথে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ আলাদা। বর্ষার শেষে নদীগুলো অপেক্ষাকৃত শান্ত থাকায় সদরঘাট থেকে রাতের লঞ্চে করে বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, ঝালকাঠি বা বরগুনার যাত্রা করা যায়। সকালে পৌঁছালে দিনের শুরু থেকেই ঘোরাঘুরির সুযোগ তৈরি হয়।
উজিরপুরের সাতলা বিল শরতকালে লাল শাপলার রাজ্যে পরিণত হয়, যা একদিনের ভ্রমণে দেখা সম্ভব। ঝালকাঠির ভিমরুলি এবং পিরোজপুরের আটঘর-কুড়িয়ানা পেয়ারাবাগান ও বাজার দেশব্যাপী পরিচিত। বর্ষায় পর্যটকের আনাগোনা বাড়লেও বছরজুড়েই এখানে ভাসমান বাজার বসে। সরু খাল বেয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের উৎপাদিত পণ্য নৌকায় করে নিয়ে আসেন এবং বিক্রি করেন। বরিশাল অঞ্চলের বিভিন্ন জলপথে এমন ভাসমান বাজারের দেখা মেলে, যা জলপথনির্ভর জনপদের জীবনযাত্রার চিত্র তুলে ধরে।
বরিশাল শহরের পুরোনো স্থাপত্যকলাও দর্শনীয়। শহরে অক্সফোর্ড মিশন এপিফ্যানি চার্চসহ ঔপনিবেশিক আমলের বেশ কিছু স্থাপনা রয়েছে। এর পাশাপাশি বরিশালের লাকুটিয়া জমিদারবাড়ি, কড়াপুর মিয়াবাড়ি মসজিদ, মোগল ব্রিজ, ঝালকাঠির রাজাপুরের সাতুরিয়া জমিদারবাড়ি, কীর্তিপাশা জমিদারবাড়ি, নলছিটির সুজাবাদ কেল্লা, বেতাগীর বিবিচিনি মসজিদ ও পিরোজপুরের রায়েরকাঠি জমিদারবাড়ির মতো ঐতিহাসিক নিদর্শন রয়েছে। দুর্গাসাগর ও গজনীর দিঘিসহ পুরোনো অনেক দিঘি ও স্থাপনায় দক্ষিণাঞ্চলের ইতিহাসের নানা অধ্যায় লুকিয়ে আছে।
ভোলার মনপুরা ও পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালির মতো জনপ্রিয় স্থান ছাড়াও উপকূলজুড়ে অনেক চর ও দ্বীপ রয়েছে, যেখানে জনবসতি কম। বর্ষা শেষে সাগর শান্ত থাকায় কম ভিড়ের মধ্যে এসব চর ও দ্বীপ ঘুরে দেখা যায়। ঢাকা থেকে ভোলা বা পটুয়াখালীগামী লঞ্চে রাতভর ভ্রমণ শেষে ভোরে চরফ্যাশন, রাঙ্গাবালি বা চর মন্তাজের পথে রওনা দেওয়া যায়। স্থানীয় নৌকা ভাড়া করে আশপাশের চর ও দ্বীপে যাওয়া যায়। চর কুকরি–মুকরি, চর মন্তাজ, ঢালচর ও মনপুরায় থাকার ব্যবস্থা থাকলেও যেখানে থাকার সুযোগ নেই, সেখানে দলবদ্ধভাবে তাঁবু নিয়ে ক্যাম্পিং করা যায়।
বরগুনার তালতলী থেকে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা পর্যন্ত বিস্তৃত টেংরাগিরি বা ফাতরার বন বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা একটি শ্বাসমূলীয় বন, যা একসময় সুন্দরবনের অংশ ছিল। বরগুনার পাথরঘাটায় হরিণঘাটা সংরক্ষিত বন এবং ভোলার চর কুকরি–মুকরিসহ উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় নানা ধরনের উপকূলীয় বন রয়েছে। সংরক্ষিত বনে নিয়ম মেনে ঘুরে দেখা এবং নির্ধারিত জায়গায় ক্যাম্পিংয়ের সুযোগ রয়েছে।
পটুয়াখালীর কুয়াকাটা দেশের অন্যতম পরিচিত পর্যটনগন্তব্য, যেখানে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত—দুটোই দেখা যায়। তবে বরিশাল অঞ্চলে আরও কয়েকটি ছোট-বড় সৈকত রয়েছে। বরগুনার তালতলীর শুভসন্ধ্যা সৈকত, পাথরঘাটার লালদিয়া সমুদ্রসৈকত এবং ভোলার চরফ্যাশনের তারুয়া সমুদ্রসৈকতে তুলনামূলক নিরিবিলি পরিবেশে সাগর দেখা যায়।
দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা স্থানীয় উৎসব ও মেলা। বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন এলাকায় গ্রামীণ মেলা ও ধর্মীয়-সামাজিক উৎসব বসে। ভ্রমণের আগে স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে এসব আয়োজনের সময়সূচি জানলে শুধু দর্শনীয় স্থান নয়, দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গেও পরিচিত হওয়ার সুযোগ মিলবে।