বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল, ঝাউবনের শনশন শব্দ আর সমুদ্রের নয়নাভিরাম সূর্যাস্ত—সব মিলিয়ে অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বরগুনা। তবে অপার এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসে পথঘাট, থাকার সুব্যবস্থার অভাব ও নিরাপত্তা সংকটের কারণে প্রতিদিন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকেরা।
বরগুনার তালতলীতে রয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সুন্দরবনখ্যাত শ্বাসমূলীয় বন ‘টেংরাগিরি’। যার আয়তন ১৩ হাজার ৬৪৪ একর। ২০১০ সালে এটিকে পশু-পাখির অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়। এখানে সুন্দরী, কেওড়া, গেওয়া, ছইলা, খালিসা, কাঁকড়া, গরান, বাইনসহ বিভিন্ন প্রজাতির লবণ ও মিঠাপানির গাছ রয়েছে। পাশাপাশি শত শত বছরের পুরোনো মোটা ও বাঁকানো নানা প্রজাতির লতা রয়েছে, যা পর্যটকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে।
এ ছাড়া এই বনে দেখা মেলে মায়াবী হরিণ, মেছোবাঘ, মিঠাপানির কুমির, বনমোরগ, বানর, কাঠবিড়ালিসহ নানা প্রজাতির পাখি। এই বনাঞ্চলে ২০১৩ সালে নির্মাণ করা হয় টেংরাগিরি ইকোপার্ক। তখন বনের ভেতর দিয়ে প্রায় তিন কিলোমিটার আঁকাবাঁকা ইটের সড়ক নির্মাণ করা হয়। ওই সড়ক দিয়ে হেঁটে যাওয়া যায় বঙ্গোপসাগরের তীরে। সেখানে রয়েছে বিস্তীর্ণ সৈকত, যেখান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত উপভোগ করা যায়।
বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে অবস্থিত ‘নিদ্রা পয়েন্ট’ বা নিদ্রারচর সৈকত বর্তমানে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। সীতাকুণ্ডের গুলিয়াখালী সৈকতের আদলে গড়ে ওঠা এ সৈকতে রয়েছে সারি সারি ছইলা ও কেওড়া গাছের শ্যামল ছায়া। গাছের নিচে প্রাকৃতিক সবুজ ঘাসের গালিচা, সৈকতের প্রান্তে খাঁজকাটা ছোট ছোট ঘাসের খণ্ড এবং প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত পর্যটকদের মুগ্ধ করে। এখান থেকে উপভোগ করা যায় বঙ্গোপসাগরের গর্জন ও নয়নাভিরাম সূর্যাস্ত।
ইতিমধ্যে এই পর্যটনকেন্দ্রটি পর্যটকদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। তবে এখানে পর্যটকদের যাতায়াত করতে হয় প্রায় এক কিলোমিটার সরু মাটির সড়ক দিয়ে। নেই পর্যাপ্ত হোটেল, সুপেয় পানির ব্যবস্থা কিংবা ওয়াশরুম। ফলে পর্যটকদের পড়তে হয় চরম ভোগান্তিতে।
শুভসন্ধ্যা সৈকত নামের মতোই সুন্দর একটি পর্যটন স্পট। পায়রা, বলেশ্বর ও বিষখালী নদীর বঙ্গোপসাগরে মিলনস্থলে এর অবস্থান। এখানে রয়েছে সারি সারি ঝাউগাছ। বঙ্গোপসাগর থেকে আসা বাতাস ঝাউগাছের পাতার সঙ্গে ধাক্কা খেলে শনশন শব্দে মন জুড়িয়ে যায়। এ ছাড়া রয়েছে প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকত, যেখান থেকে দেখা যায় অপূর্ব সূর্যাস্ত। এখানে রাত্রিযাপনের জন্য উপজেলা প্রশাসনের নির্মিত একটি দৃষ্টিনন্দন ডাকবাংলো থাকলেও নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা।
তালতলীর টেংরাগিরি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ২০১০-১১ ও ২০১১-১২ অর্থবছরে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রায় ২ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় ‘টেংরাগিরি ইকোপার্ক’। কিন্তু নির্মাণের পর দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় স্থাপনাগুলো এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। তা ছাড়া সরকারি ও বেসরকারিভাবে কোনো গেস্টহাউস নির্মাণ করা হয়নি। তাই পর্যটকদের জন্য নেই কোনো থাকার ব্যবস্থা।
শুভসন্ধ্যা সমুদ্রসৈকতে উপজেলা প্রশাসনের একটি ডাকবাংলো থাকলেও নেই নিরাপত্তাকর্মী। তাই এখানে রাত্রিযাপন করছেন না কোনো পর্যটক। নিদ্রা পয়েন্ট পর্যটনকেন্দ্রে পর্যটকদের রাত্রিযাপনের জন্য নেই কোনো গেস্টহাউস।
এ ছাড়া ঢাকা-কুয়াকাটা সড়ক দিয়ে আসা পর্যটকদের আমতলী থেকে এসব পর্যটন স্পটে যাওয়ার একমাত্র সড়কটি বেশির ভাগ সময় ভাঙাচোরা অবস্থায় থাকে। ফলে এই সড়ক ব্যবহার করে একবার আসার পর দ্বিতীয়বার আর আসতে চান না অনেক পর্যটক।
সঠিক পরিকল্পনার অভাব ও স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্বহীনতার কারণে পর্যটনকেন্দ্রগুলো জৌলুশ হারাচ্ছে বলে অভিযোগ পর্যটকদের।
নিদ্রারচর সৈকতে ঘুরতে আসা পর্যটক সোনিয়া আক্তার বলেন, "স্থানটি অত্যন্ত সুন্দর। এখানে ঘুরতে ও সময় কাটাতে ভালো লাগে। কিন্তু ওয়াশরুম না থাকায় নারী ও শিশুদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। দ্রুত আধুনিক ওয়াশরুম নির্মাণ করা জরুরি।"
পর্যটন ব্যবসায়ী নাঈম হোসেন বলেন, "আমি দীর্ঘদিন ধরে কুয়াকাটায় পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে তালতলীর পর্যটন স্পটগুলো পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। আমি অনেক সময় কুয়াকাটায় আসা পর্যটকদের এখানে নিয়ে আসি। কিন্তু পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই। বিশেষ করে যোগাযোগ সড়কগুলো অত্যন্ত ভাঙাচোরা।"
বরগুনা জেলা ট্যুরিস্ট ম্যানেজমেন্টের সভাপতি আরিফ রহমান বলেন, "তালতলীর এই অপার সম্ভাবনাময় পর্যটন স্পটগুলোকে পরিকল্পিতভাবে সাজাতে হবে সরকার। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের পর্যটন এলাকার আশপাশে সরকারি জমি বরাদ্দ এবং ঋণ প্রদান করে হোটেল-মোটেল নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত। এতে পর্যটনকেন্দ্রিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এতে এই অঞ্চলে বৈপ্লবিক অর্থনৈতিক পরিবর্তন ঘটবে।"
বন বিভাগের সাকিনা বিট কর্মকর্তা রহিমুল ইসলাম জুমেল বলেন, "টেংরাগিরি ইকোপার্কের স্থাপনাগুলো সংস্কারের জন্য একটি প্রকল্প তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন হলে টেংরাগিরি ইকোপার্কের সমস্যাগুলোর সমাধান হবে।"
বরগুনা জেলা প্রশাসক তছলিমা আক্তার বলেন, "তালতলীর পর্যটন শিল্পকে পরিকল্পিতভাবে পর্যটকবান্ধব করে গড়ে তুলতে তাদের সাধ্যের মধ্যে জেলা প্রশাসন কাজ করছে। বৃহৎ উন্নয়নের জন্য পর্যটন মন্ত্রণালয়কে জানানো হবে। পাশাপাশি যেসব ছোটখাটো সমস্যা রয়েছে, সেগুলো দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।"
বরগুনা-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. ওলি উল্লাহ জানান, "আমার নির্বাচনী ওয়াদা ছিল বরগুনার পর্যটন স্পটগুলোকে আধুনিকায়ন করব। তাই পর্যটন মন্ত্রণালয়কে বরগুনার নয়নাভিরাম এসব পর্যটন স্পটকে বিশ্বমানের পর্যটন স্পট হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়ে অবহিত করব। আশা করি, বড় একটি পরিকল্পনার মাধ্যমে বরগুনার পর্যটন শিল্পকে বিকশিত করতে পারব।"