বাতু কেভের অভিজ্ঞতা তখনো মাথায় ঘুরছে। এর মধ্যে রওনা দিলাম থিয়ান হো মন্দিরের দিকে। মন্দিরে পৌঁছে প্রথমেই চোখে পড়ল লাল রঙের বহুতল ছাদ। কার্নিশে ড্রাগনের মূর্তি। খুঁটি ও দেয়ালে অভিনব কারুকাজ।
মন্দিরের ভেতর আলো-ছায়ার খেলা। কোথাও প্রার্থনারত মানুষ। কোথাও ছবি তুলছেন দর্শনার্থীরা। বাতু কেভের পাহাড়ি গুহা থেকে এখানে এসে মনে হলো, মালয়েশিয়ার ধর্মীয় পরিসরের সম্পূর্ণ আলাদা ঐতিহ্যের মধ্যে ঢুকে পড়েছি।
থিয়ান হো মন্দিরের প্রধান আরাধ্যা দেবী মাৎসু, চীনা সমুদ্রযাত্রীদের রক্ষাকর্ত্রী। সমুদ্রের সঙ্গে যাঁদের জীবিকা ও যাতায়াতের সম্পর্ক, মাৎসু তাঁদের উপাস্য।
চীনের দক্ষিণ উপকূল ও হাইনান দ্বীপ থেকে আসা মানুষেরা অভিবাসনকালে তাঁদের ধর্মবিশ্বাসের এ ধারাও সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। বর্তমান মন্দিরটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৮১ সালে। প্রায় আট বছর পর আনুষ্ঠানিকভাবে জনসাধারণের জন্য এটি খুলে দেওয়া হয়।
মন্দিরের ছাদের দিকে তাকিয়ে ইতিহাসের দৃশ্যমান চিহ্নগুলো খুঁজছিলাম। ড্রাগন, ফিনিক্স, লাল ও সোনালি রঙের আধিক্য চীনা স্থাপত্যসহ প্রতীকী শিল্পের পরিচিত ভাষা।
চীনা সংস্কৃতিতে লাল রং সৌভাগ্য ও উৎসবের আবহ নিয়ে আসে। অন্যদিকে সমৃদ্ধির রং সোনালি। ছাদের বাঁক, উঁচু কার্নিশ, খুঁটির অলংকরণে কারিগরদের নৈপুণ্য স্পষ্ট। মন্দিরটি যেন চীনা শিল্পরীতির এক উন্মুক্ত প্রদর্শনী।
এ মন্দিরে মাৎসুর পাশাপাশি গুয়ানইনের (মতান্তরে কুয়ানইন) উপাসনাও হয়। গুয়ানইন একজন বোধিসত্ত্ব, যাকে চীনারা করুণা ও সহমর্মিতার দেবী হিসেবে মানে। বৌদ্ধ লোকগাথা অনুযায়ী, কারও মৃত্যু হলে গুয়ানইন তাকে একটি পদ্মের হৃদয়ে বসিয়ে পশ্চিমের পবিত্র ভূমি সুখাবতীতে পাঠিয়ে দেন।
চীনা ধর্মীয় সংস্কৃতিতে বৌদ্ধ, তাওবাদী ও কনফুসীয় চিন্তার অসংখ্য ধারা বহুকাল ধরে পাশাপাশি চলছে। থিয়ান হো মন্দিরেও সেই মিশ্র ঐতিহ্যের ছাপ দেখতে পেলাম। ধর্মকে এখানে আলাদা আলাদা ঘরে বন্দী করে বোঝা কঠিন।
আমার মনে হয়, একটি দেশকে চিনতে গেলে এর বহুত্বকে শুধু পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে চলে না। সেই বহুত্ব কোথায় দৃশ্যমান, মানুষের কাছে কীভাবে মান্যতা পায়, কোন স্থাপনা সেই স্মৃতি বহন করে, এসব বুঝতে হয়। থিয়ান হো মন্দিরে দাঁড়িয়ে মালয়েশিয়ার সেই রূপ আরও স্পষ্ট হলো।
রাতে হোটেলে ফিরতে ফিরতে ভাবছিলাম, কত রকম স্থাপত্য, কত আলাদা পরিবেশ দেখলাম। একদিকে আধুনিক মহানগরের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে চুনাপাথরের গুহায় ধর্মীয় বিশ্বাস, চীনা ঐতিহ্যের মন্দির, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা, ফুলের দেশ ক্যামেরন হাইল্যান্ড।
এত কিছুর পরও মনে হচ্ছিল, মালয়েশিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অধ্যায়টি এখনো বাকি। সেই অধ্যায়ের নাম মালাক্কা।
চলবে
*অমৃতা ইশরাত: ব্যাংকার ও লেখক