টাঙ্গাইলের খান পরিবারের ছোট ছেলে সানিয়াত খান (বাপ্পা) ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম ফারুক হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন। এটি এই পরিবারের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে প্রথমবারের মতো সাজা দেওয়ার ঘটনা। দীর্ঘ চার দশক ধরে হত্যা, চাঁদাবাজি ও অস্ত্রবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে আলোচিত এই পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে অনেক মামলা হলেও কারও সাজা হয়নি। গতকাল সোমবার টাঙ্গাইলের প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. ফয়সাল আল মামুন সদর উপজেলার দাইন্যা ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল হত্যা মামলায় এই রায় দেন। রায়ে সানিয়াতসহ তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং চারজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। নিহত রফিকুল সদর উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি ছিলেন।
টাঙ্গাইলে আওয়ামী রাজনীতির ইতিহাসে খান ও সিদ্দিকী পরিবারের দ্বন্দ্ব উল্লেখযোগ্য। ১৯৯০ সালে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী দেশে ফেরার পর এই দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে। শামসুর রহমান খানের পক্ষে তাঁর ভাতিজারা আমিনুর রহমান খান (বাপ্পি), আমানুর রহমান খান (রানা) ও সহিদুর রহমান খান (মুক্তি) একটি বাহিনী গড়ে তোলেন। ২০০৩ সালে আমিনুর নিহত হওয়ার পর জাহিদুর রহমান খান (কাকন) ও সানিয়াত খান (বাপ্পা) এই বাহিনীতে যোগ দেন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর খান পরিবারের প্রভাব বেড়ে যায়। ২০১১ সালে সহিদুর টাঙ্গাইল পৌরসভার মেয়র এবং ২০১২ সালে আমানুর সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সানিয়াত কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি হন। এরপর থেকে জেলার ব্যবসা, রাজনীতি ও ঠিকাদারি খাতে তাদের নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়।
চার ভাইয়ের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি ও দখলসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা হলেও সাজা হয়নি। আমানুরের বিরুদ্ধে অন্তত ৫টি হত্যা মামলাসহ অর্ধশতাধিক মামলা, সহিদুরের বিরুদ্ধে ৫টি হত্যা মামলাসহ প্রায় ৪০টি মামলা, জাহিদুরের বিরুদ্ধে ৩টি হত্যা মামলা এবং সানিয়াতের বিরুদ্ধে ৪টি হত্যাসহ ডজনখানেক মামলা রয়েছে। মামলাগুলো রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহার বা বাদীপক্ষের ওপর চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে তুলে নেওয়া হতো। গত বছর আওয়ামী লীগ নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদ হত্যা মামলায়ও চার ভাই বেকুসুর খালাস পান।
ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ২০১৩ সালের ২০ ডিসেম্বর প্রাতর্ভ্রমণে বের হন। সকাল ছয়টার দিকে শহরের বটতলা বাজার এলাকায় দুর্বৃত্তরা তাঁকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করেন। পরদিন তাঁর ভাই লাভলু মিয়া সদর থানায় মামলা করেন। তদন্ত চলাকালে ২০১৬ সালে শাজাহান, সুজন ও সানোয়ার হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন যে, সানিয়াত ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে এই হত্যাকাণ্ড করিয়েছেন।
রফিকুল হত্যার আগেই সানিয়াত ২০১৪ সালে দেশ ছাড়েন। পরে ফারুক হত্যা মামলায় জাহিদুরও দেশত্যাগ করেন। ফারুক হত্যা মামলায় দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকার পর আমানুর ও সহিদুর মুক্ত হন। বর্তমানে তারা আত্মগোপনে রয়েছেন।