অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বিয়ে হয়েছিল সুইটি আক্তারের। তবে সেই দাম্পত্য জীবন সুখের হয়নি। স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ও ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পর তিনি তাঁর একমাত্র সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন। পরবর্তীতে পরিবারের চাপে তিনি দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন। কিন্তু সেই দ্বিতীয় স্বামীও সৌদি আরবে যাওয়ার পর তাঁর সঙ্গে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। চরম অসহায়ত্বের মুখে পড়ে সুইটি আক্তার দিশেহারা হয়ে পড়েন।
মেয়ের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন এবং বাবার সংসারের অভাব দূর করার তাড়নায় তিন বছর আগে সৌদি আরবে পাড়ি জমান সুইটি আক্তার। সেখানে তিনি পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ শুরু করেন। তবে সৌদি আরবে যাওয়ার মাত্র ছয় মাসের মাথায় তিনি গ্রেপ্তার হন। সেই সময় সুইটি আক্তার তাঁর পরিবারকে জানিয়েছিলেন যে, সৌদি আরবে তাঁর সঙ্গে কাজ করা অন্য কয়েকজন নারী অবৈধভাবে একটি গাড়ি কিনেছিলেন। সেই ঘটনায় তাঁদের সঙ্গে তাঁকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায়ও মা-বাবার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল। মাঝেমধ্যে ফোন দিতে না পারলেও তিনি তাঁদের দুশ্চিন্তা করতে নিষেধ করেছিলেন। সর্বশেষ ১৩ অক্টোবর (গত মঙ্গলবার) সন্ধ্যায় বাবার সঙ্গে তাঁর কথা হয়। এর দুই দিন পর সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার খবর পান তাঁর মা-বাবা।
মা জহুরা বেগম কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “মা তুই কত দুঃখ পাইয়া গেছস, কেউর কাছে কইলি না। আমার কাছেও কইলি না...আমার মাইয়ার লাশ আইনা দাও। আমি ওরে দেহুম।”
সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদে অনৈতিক কাজ করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করার পর সম্প্রতি দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে ১৪ অক্টোবর (গত বুধবার) এ তথ্য নিশ্চিত করেছে সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ)। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এই দুই বাংলাদেশির নাম নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তার।
মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জহুরুল আলম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনাটি তাঁরা জেনেছেন।
সুইটি আক্তারের বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলায়। তিনি এই উপজেলার একটি গ্রামের বাসিন্দা মো. ফজল মিয়া ও জহুরা বেগমের কন্যা। পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট।
আজ মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে সুইটি আক্তারের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, উঠানে কয়েকজন জড়ো হয়ে কথা বলছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ সুইটির স্বজন, আবার কেউ প্রতিবেশী। সুইটির মা-বাবা তখন ঘরের বারান্দায় বসে ছিলেন।
মেয়ের কথা জিজ্ঞাসা করতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন মা জহুরা বেগম। কোনোমতে নিজেকে সামলে তিনি বলেন, ‘আমি কেমনে বাঁচুম রে, আমার সুইটিরে আইনা দ্যাও রে।’ কান্নার তীব্রতায় কথা বলতে পারছিলেন না জহুরা বেগম। একপর্যায়ে তিনি আর্তনাদ করে বলেন, “মা তুই কত দুঃখ পাইয়া গেছস, কেউর কাছে কইলি না। আমার কাছেও কইলি না...আমার মাইয়ার লাশ আইনা দাও। আমি ওরে দেহুম।”
পরে কথা হয় সুইটি আক্তারের বাবা মো. ফজল মিয়ার সঙ্গে। তিনি জানান, “একটি এজেন্সির মাধ্যমে ২০২৩ সালের মার্চে সৌদি আরবে যায় মেয়ে। সেখানে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করত। সৌদিতে যাওয়ার পর প্রায় ছয় মাস মেয়ের সঙ্গে তাঁদের নিয়মিত কথা হতো। এরপর হঠাৎ একদিন মেয়ে ফোন করে জেলে বন্দী থাকার কথা জানায়। ওর (সুইটি) কয়েকজন বান্ধবী অবৈধভাবে নাকি একটি গাড়ি কিনেছিল, সে কারণে অন্যদের সঙ্গে মেয়েকেও গ্রেপ্তার করেছে। কারাগারে থাকা অবস্থায় কোনো কোনো সময় এক সপ্তাহ আবার কোনো সময় এক মাস পর কথা হতো। এভাবে এক বছর চলার পর হঠাৎ যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।”
সুইটির স্বজনদের দৃঢ় বিশ্বাস, তিনি সৌদি আরবে কারও না কারও গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো পরিবারের কেউ বিশ্বাস করতে পারছেন না।
ফজল মিয়া আরও জানান, দীর্ঘ এক বছর পর সুইটি পুনরায় ফোনে যোগাযোগ করেন। তখনও তিনি জেলে থাকার কথা বলেছিলেন এবং ফোন না দিলেও যেন দুশ্চিন্তা করা না হয়, তা অনুরোধ করেছিলেন। এভাবে প্রায় চার মাস চলে। এরপর আর কোনো যোগাযোগ ছিল না। সর্বশেষ মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) মাগরিবের নামাজের পর সুইটির সঙ্গে কথা হয়। তবে বিচার বা মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে তিনি কিছু জানাননি।
সুইটির মা-বাবার সঙ্গে কথা বলার সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন তাঁর চাচাতো বোন সালমা আক্তার। বয়সে তিনি সুইটির বড়। তিনি জানান, স্বামীর সংসারে থাকার সৌভাগ্য হয়নি সুইটির। দ্বিতীয় বিয়ের পর ধারদেনা করে জামাতাকে সৌদি আরবে পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। পরে ভাগ্য বদলাতে মেয়েকে এক বোনের কাছে রেখে সৌদি আরবে যান সুইটি। তাঁর নয় বছর বয়সী মেয়ে স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে।
কথা বলার সময় বারবার চোখের পানি ফেলছিলেন সালমা আক্তার। একপর্যায়ে কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে তিনি বলেন, সুইটি কোনো অন্যায় কাজ করতে পারে না। পরে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “আমার চাচায় মাটি কাইট্যা ভাত খায়। অভাবের সংসার। বাপ–মায়ের অভাবে...বাইরে গেছে। ওরা পাঁচটা বোন। চাচার কোনো ছেলে নাই। ওর (সুইটি) যে এই অবস্থা অইবো, জানলে কি আর বিদেশে যাইবার দিতাম।”