ইংরেজ আমলে ঢাকা ছিল একটি ছোটো মফস্বল শহর। সে সময়কার সকল কাজকর্ম, চাকরি-বাকরি এবং বাণিজ্যিক লেনদেন কলকাতায় সম্পন্ন হতো। বিয়ের আয়োজন, রোগীর চিকিৎসা, ছেলের মুসলমানির দাওয়াতিদের খাওয়ানো, সদাইয়ের ব্যবস্থা, ধনী পরিবারের মেয়ের নাক-ফোড়ানির উৎসব বা পুতুলের বিয়ের ‘লওয়াজিমা’র ফর্দ—এমনকি এসব বিষয়েও মানুষকে ছুটতে হতো কলকাতায়। তখন কলকাতা যাওয়ার পথ ছিল নারায়ণগঞ্জ বা কার্তিকপুর হয়ে গোয়ালন্দ, সেখান থেকে স্টিমারে করে।
এক কৃপণ গেরস্ত তার মেয়ের বিয়ের বাজার করতে কলকাতা যাচ্ছিলেন। স্টিমারে গোয়ালন্দে পৌঁছে সেখান থেকে ট্রেনে কলকাতা যেতে হতো। গোয়ালন্দ স্টিমারঘাট তখন বেশ জমজমাট এলাকা ছিল। দোকানপাট, ফেরিওয়ালা, হোটেল, নৌকায় ভাসমান হোটেল, কুলি ও মিস্ত্রিদের ছোটাছুটি ও হৈচৈ—সব মিলিয়ে ঘাটটি ছিল এক বিশাল এলাহিকাণ্ড। কৃপণ গেরস্ত ভাবলেন, রাস্তাঘাটে খেয়ে পয়সা নষ্ট করা ঠিক নয়। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, কলকাতায় পৌঁছানোর পর যথাযথভাবে কিছু খেয়ে নেবেন। কিন্তু তিনি খেয়াল করেননি যে, নদীপথে যাত্রাকালে বাতাস ও নদীর আবহাওয়ার প্রভাবে ক্ষিধা দ্রুত লাগে এবং তা চবড় করে বাড়তে থাকে।
অতএব, কিছু খেয়ে নেওয়ার ইচ্ছায় তিনি ঘাটের এক হোটেলে ঢুকলেন। হোটেলে তখন মেলা লোক খাচ্ছে। গ্রাহকরা খেয়েদেয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে পয়সা দিচ্ছেন। ম্যানেজার একজন পয়সা দিতে তার সামনে আসলেই ক্রিং ক্রিং বেল বাজায়। ওদিকে বয়রা চিৎকার দিয়ে ওঠে, "সামনে চার আনা, তার পেছনে তিন, তার পেছনে সাড়ে ছ আনা, গুনে বুঝে নিন।"
আমাদের কৃপণ লোকটাও সেই হোটেলে খেতে গেছেন। তার ভয়, হৈটাল আলারা গলাকাটা দাম নেয়। তাই এক টেবিল বয়কে কাছে ডেকে সে জিজ্ঞাসা করে, "সস্তায় কী খাওন যায়, ক তো! ভাত খামু।"
বয়: "ভাত, নুন, পানি, সব চাইতে সস্তা, তিন পয়সা। আর লগে একখান পোড়া সিটি শুকনা মরিচ লইলে এক আধলা বেশি।"
কৃপণ লোক: "নারে, অত শুকনা ভাত গলা দিয়া যাইব না।"
বয়: "পানি দুই গেলাস খাইবেন, তাইলেই যাইব।"
কৃপণ: "আর একটু দামী খাওনের কথা কও বাজান।"
বয়: "তাইলে ভাত লন, আর ইলশা মাছের সুরা লন, সঙ্গে মাছ লইলে পড়ব ছয় আনা, শুধু সুরা আর ডাইল লইলে পড়ব তিন আনা। আর এক কাম করবার পারেন, সে ব্যবস্থাও এই হৈটালে আছে।"
কৃপণ লোক: "কী ব্যবস্থারে বাজান!"
বয়: "আপনে ভাত আর ইলশা মাছের সুরুয়া লইবেন। আর আপনের সামনে একটা বাটিতে থাকব ফৈর-আলা তেলে-ঝোলের একখান দবজ (পুরুষ্ট) পেটি; ভাত খাইবেন ইলশার সুরা দিয়া, তয় ঐ পেটি দেইখ্যা দেইখ্যা আর পেটিই খাইতেছেন মনে কইরা খাইতে পারেন। তাতে আর এক আনা বেশি পড়ব। ঐ এক আনা চোখ লাগানির জন্য। যে মানুষটা পরে ঐ পেটি দাম দিয়া কিনা খাইব তার পেট সাথে সাথে গটরমটর করলে আমরা ফ্রি বড়ি সাপ্লাই দেই। হেই বড়ি কিনতে আধ আনা, আর আপনের দেখন সুখ খাওনের চার্জ আধ আনা।"
আমাদের কৃপণের এই ব্যবস্থা পছন্দ হয়। সে দেখন সুখ খাওয়ার অর্ডার দেয়। আর চার আনা পয়সাও খুতির ভেতর থেকে বের করে রাখে। খাওয়া শেষে বয় ম্যানেজারের ক্রিং শুনে বলে, "তিন নম্বরে দেখন সুখ অলার ড্যামাইজ (ডেমারেজ) চার্জসহ সাড়ে চাইর আনা।"
কৃপণ: "কেন, কেন, আধ আনা বেশি কেন?"
বয়: "ইলশার পেটিতে যে চাটন দিছ, তা দেখি নাই। তার জন্য জরিমানা মাত্রই আধ আনা।"
[সৈয়দ মুজতবা আলী (১৯০৪-১৯৭৪) বাংলা ভাষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার ও অনুবাদক। ভ্রমণকাহিনির জন্য তিনি বিশেষভাবে জনপ্রিয় এবং রম্যরচনায় রীতিমতো অপ্রতিদ্বন্দ্বী।]