বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির ঘোষণা দিয়েছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য সহনীয় রাখতে বিদ্যমান করকাঠামোর বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করা হবে। এছাড়া দেশে উৎপাদিত পণ্য এবং যেসব পণ্যের ঋণপত্র (এলসি) খোলা হয়েছে বা জাহাজীকরণের পর্যায়ে রয়েছে, সেসব তথ্যও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে।
আজ সোমবার ঢাকায় সচিবালয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি পর্যালোচনাবিষয়ক বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন। বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, পণ্যের সরবরাহব্যবস্থা আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে 'ট্রেসেবিলিটি' ব্যবস্থা চালু করা হবে। এই কার্যক্রমে ডিম ও পোলট্রিসহ গুরুত্বপূর্ণ নিত্যপণ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি পণ্য কোথা থেকে উৎপাদন বা আমদানি হলো, কোন পর্যায়ে কার হাতে গেল, কীভাবে পরিবহন ও সংরক্ষণ হলো এবং শেষ পর্যন্ত কোথায় বিক্রি হলো—এসব তথ্য শনাক্ত ও অনুসরণ করা সম্ভব হবে।
বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, "আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে এর অর্থনৈতিক চাপ বাংলাদেশকেও বহন করতে হয়। তাঁর মতে, সরকার ভোক্তাদের ওপর পুরো চাপ একবারে না দিয়ে এর একটি অংশ বহন করলে শেষ পর্যন্ত তা রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থার ওপর পড়ে। তাই জ্বালানির দক্ষ ও সাশ্রয়ী ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, নিত্যপণ্যের বাজারে কোনো ধরনের অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে দেওয়া হবে না। কেউ বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অযৌক্তিকভাবে পণ্যের দাম বাড়ালে বা অতিরিক্ত মুনাফা করার চেষ্টা করলে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।"
বৈঠকে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারি কমিশনের (বিটিটিসি) পক্ষ থেকে নিত্যপণ্যের চাহিদা, আমদানি, সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরা হয়। বিটিটিসি জানায়, গত বছরের তুলনায় নিত্যপণ্যের আমদানি ও এলসি খোলার পরিস্থিতি ইতিবাচক। দেশে বছরে মসুর ডালের চাহিদা প্রায় সাত লাখ টন। গত বছরের ১ জুলাই থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪২ হাজার টন মসুর ডাল আমদানি হয়েছিল। চলতি বছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার টন। এদিকে ভোজ্যতেলের কাঁচামাল (তেলবীজ) আমদানিও বেড়েছে। গত বছরের একই সময়ে ২ লাখ ৭৩ হাজার টন তেলবীজ আমদানি হয়েছিল। চলতি বছর তা বেড়ে ৩ লাখ ৮৬ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে।
দেশে বছরে চিনির চাহিদা প্রায় ২০ থেকে ২১ লাখ টন। এর মধ্যে শুধু রমজান মাসেই প্রায় ৩ লাখ টন চিনির চাহিদা তৈরি হয়। সামগ্রিকভাবে নিত্যপণ্যের আমদানি ও পাইপলাইন পরিস্থিতি ইতিবাচক বলে জানায় বিটিটিসি।
নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে মানুষের আস্থা ধরে রাখতে সারা বছর বাজার নজরদারি জোরদারের ঘোষণা দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, শুধু রমজান মাসকে কেন্দ্র করে নয়, সারা বছর নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখাই সরকারের লক্ষ্য। এ জন্য ব্যবসায়ী সংগঠন, আমদানিকারক, উৎপাদক এবং সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো হবে।
সাম্প্রতিক বাজার পরিস্থিতির বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, গ্যাস সরবরাহে বিঘ্নের কারণে বিভিন্ন শিল্পের উৎপাদন কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। পণ্য পরিবহনেও তৈরি হয়েছে প্রতিবন্ধকতা। ঝড়-বৃষ্টিসহ প্রতিকূল আবহাওয়ার প্রভাবও কয়েকটি এলাকার বাজারে পড়েছে। তবে শীতকাল সামনে থাকায় অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন সবজি বাজারে আসতে শুরু করবে। এতে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে নিয়মিত বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের আহ্বান জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, পণ্যের দামে দুই-চার টাকার অস্বাভাবিক ওঠানামা সামগ্রিক হিসাবে বড় মনে না হলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে বাজার নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে। তাই বাজার স্থিতিশীল রাখার পাশাপাশি মানুষের আস্থা ধরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
বাজার নজরদারি বাড়াতে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে তদারক কার্যক্রম জোরদার করা হবে বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমদানিকারকদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করে মজুত, আমদানি ও সরবরাহ পরিস্থিতিও পর্যালোচনা করা হবে।
বৈঠকে বাণিজ্যসচিব মো. আতাউর রহমান খান, বিটিটিসির চেয়ারম্যান নাসির উদ দৌলা, জাতীয় ভোক্তা–অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম এবং ডাল, তেল, খেজুর, ডিম ও চিনি আমদানিকারক ও ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানায়।