জামালপুরের ইসলামপুরে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে সরকারের ‘আপৎকালীন জরুরি প্রতিরক্ষা’ প্রকল্পের আওতায় ২৯ লাখ ৯৮ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি বাঁধ মাত্র ২৯ দিনেই ধসে পড়েছে। ৭ হাজার ২০০টি জিও ব্যাগ ব্যবহার করে নির্মিত এই প্রতিরক্ষা বাঁধের ২০ মিটার অংশ গত ২০ আগস্ট সকালে নদের পেটে তলিয়ে যায়। এর কিছুদিন আগে আরও ১০ মিটার অংশ ধসে গিয়েছিল। বাঁধের এই বিপর্যয় ঢাকতে তড়িঘড়ি করে পুনরায় অতিরিক্ত জিও ব্যাগ ফেলা হলেও, স্থানীয়দের মতে এটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অপরিকল্পিত উদ্যোগ ও তদারকহীনতারই ফল।
সরেজমিনে ইসলামপুর উপজেলার চরপুটিমারী ইউনিয়নের ৪ নম্বর চর নতুনপাড়া গ্রামে দেখা যায়, যেখানে বাঁধটি নির্মাণ করা হয়েছে, তার খুব কাছেই একটি শক্তিশালী ড্রেজিং মেশিন বসানো হয়েছে। নদী খননের নামে সেখান থেকে দিনরাত বালু তোলা হচ্ছে। প্রকৌশলবিদ্যার নিয়ম অনুযায়ী, নদীর পাড়ের তলদেশ থেকে বালু তুললে তীরের মাটির ভারবহন ক্ষমতা কমে যায়। একদিকে ঠিকাদার জিও ব্যাগ ফেলছেন এবং অন্যদিকে ড্রেজারের মাধ্যমে তলদেশের মাটি খালি করা হচ্ছে, ফলে দ্রুতই মাটি ধসে বাঁধটি তলিয়ে যাচ্ছে।
এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, জিও ব্যাগ ফেলা এবং ড্রেজার বসানোর মধ্যে চরম সমন্বয়হীনতার কারণে পুরো এলাকা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ভিটেমাটি হারানোর আতঙ্কে থাকা চর নতুনপাড়ার বাসিন্দারা এই প্রকল্পকে ‘পরিকল্পিত অপচয়’ বলে অভিহিত করেছেন।
চরের প্রবীণ বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাজ মানেই নদী ভাঙবে আর ওনাদের পকেট ভরবে। নদীর একদম পেটের ভেতর ড্রেজার চালিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। নিচের মাটিই যদি সরে যায়, তবে জিও ব্যাগ পানি ঠেকাবে কীভাবে? আমাদের দরকার স্থায়ী বাঁধ, বস্তা ফেলার এই ভেলকিবাজি আমরা আর চাই না।”
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল করিম অভিযোগ করেন, “ঠিকাদারের লোকজন যখন বস্তা ফেলছিল, তখন পাউবোর কোনো তদারকি কর্মকর্তা বা প্রকৌশলীকে এলাকায় পাওয়া যায়নি। নিম্নমানের বস্তায় নদীর ড্রেজিং করা বালু ভরে কোনোমতে ডাম্পিং করে কাজ শেষ দেখানো হয়েছে। এই অস্থায়ী বাঁধ দিয়ে আমাদের কোনো লাভ হয়নি।”
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স একরামুল হক খানের স্বত্বাধিকারী একরামুল হক খান। তিনি বলেন, “কাজটি যথাযথভাবেই সম্পন্ন করা হয়েছে। জিও ব্যাগের মান ও বালুর গুণগত মান নিয়ে কোনো অনিয়ম হয়নি। অফিসের কর্মকর্তা, প্রশাসনের প্রতিনিধি ও স্থানীয়দের উপস্থিতিতেই ব্যাগ গণনা করে ডাম্পিং করা হয়েছে। তবে আমার ধারণা, নদী খননের ফলে তলদেশে গভীরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় পানির স্রোত বেড়ে গেছে। সেই কারণেই পাড়ের কিছু অংশ ধসে পড়েছে।”
তিনি আরও দাবি করেন, বরাদ্দকৃত জিও ব্যাগের পরিমাণ ভাঙনের ঝুঁকির তুলনায় কম ছিল।
অন্যদিকে, কাজের মান নিয়ে ওঠা অভিযোগ নাকচ করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, ব্রহ্মপুত্রে ড্রেজিংয়ের ফলে নদের মুখ উন্মুক্ত হয়ে পানির প্রবাহ বেড়েছে এবং বাঁকে বাঁকে ভাঙন দেখা দিচ্ছে। তিনি বলেন, “আমাদের ইমার্জেন্সি ডিজাইনগুলো সাধারণত বেশি খরচে করা হয় না, সর্বনিম্ন খরচে উদ্দেশ্য পূরণের চেষ্টা করা হয়। কাজ চলাকালীন এবং শেষের দিকে কিছু অংশ দেবে গিয়েছিল, যা ঠিকাদার পুনরায় ঠিক করে দিয়েছে।”
তিনি আরও দাবি করেন, নিজস্ব প্রতিনিধি, ঢাকার টাস্কফোর্স এবং স্থানীয় ইউএনওর প্রতিনিধির উপস্থিতিতে কাজের মান ও বস্তার পরিমাণ পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে, তাই নিম্নমানের কাজের অভিযোগটি সঠিক নয়।