চোখের সামনে ঝাপসাভাবে কিছু কালো গোল অংশ বা ছায়া দেখা একটি সাধারণ কিন্তু উদ্বেগজনক সমস্যা। আশপাশের দৃশ্য পরিষ্কার থাকলেও কেন্দ্রে এই অস্পষ্টতা লক্ষ্য করা যায়। চক্ষু বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ‘সেন্ট্রাল সেরাস কোরিও রেটিনোপ্যাথি’ বা সংক্ষেপে সিএসসিআর (Central Serous Chorioretinopathy) নামক রোগের লক্ষণ।

চোখের ভেতরে দৃষ্টির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো রেটিনার কেন্দ্রবিন্দু, যা ‘ম্যাকুলা’ নামে পরিচিত। এর আরও সংবেদনশীল ক্ষুদ্র অংশটি হলো ‘ফোভিয়া’। যেকোনো বস্তুর আকৃতি, প্রকৃতি ও রঙ স্পষ্টভাবে উপলব্ধির জন্য এই অংশগুলোর স্বাস্থ্য অত্যন্ত জরুরি। এই অংশটি ‘কোন’ নামক বিশেষ কোষ দিয়ে গঠিত। ম্যাকুলা ও ফোভিয়ার আশপাশে রয়েছে রক্তবাহী শিরা। যদি এই শিরাগুলো থেকে রক্তের জলীয় অংশ লিক করে কোষের নিচে জমা হয়, তবে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে পড়ে। তখন ম্যাকুলা অংশের কোষ ফুলে ওঠে এবং রেটিনা থেকে দৃষ্টি সমস্যা শুরু হয়।

এই রোগের প্রধান ও একমাত্র লক্ষণ হলো যন্ত্রণাবিহীন ঝাপসা কালো গোল ছায়া দেখা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এক চোখেই সমস্যা বেশি দেখা যায়। ক্ষেত্রবিশেষ দুই চোখেও হতে পারে।

রোগটির প্রাথমিক কারণ এখনো সম্পূর্ণ জানা যায়নি। তবে কিছু ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা বা আনুষঙ্গিক কারণ রয়েছে:
১. হঠাৎ অতিরিক্ত মানসিক দুশ্চিন্তা, অতিরিক্ত পরিশ্রম বা অনিদ্রা।
২. দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত বা অনিয়মিতভাবে স্টেরয়েড ওষুধ সেবন।
৩. অতিরিক্ত ধূমপান বা মদ্যপান।
৪. ডায়াবেটিস।

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী, রোগীকে প্রথমে রোগ সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেওয়া জরুরি। বুঝতে হবে, চোখের সংবেদনশীল এলাকায় তরল জমেছে। মাটিতে পানি জমে থাকলে তা আস্তে আস্তে শুকিয়ে যায়, তেমনি নতুন করে কোনো শিরা লিক না করলে জমে থাকা পানি ধীরে ধীরে আপনা-আপনিই শুকিয়ে যাবে। তাই ভয়ের কোনো কারণ নেই। যেহেতু হঠাৎ দুশ্চিন্তা এই রোগের অন্যতম কারণ, তাই রোগীকে মানসিক চাপ কমানো জরুরি।

দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগ কমানোর ওষুধ, কিছু প্রদাহ নিরোধক চোখের ড্রপ, ভিটামিন সি, তাজা ফলমূল গ্রহণ, পর্যাপ্ত ঘুম এবং লাইফস্টাইল পরিবর্তন করলে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন নয়। তবে সুস্থ হতে সময় লাগে; ক্ষেত্রবিশেষ দুই মাসও লাগতে পারে।

অনেকের পক্ষে এই সময়কাল বেশি দীর্ঘ ও কষ্টকর মনে হলে বা অস্বস্তি বেশি হলে চোখের অ্যানজিওগ্রাফি বা ওসিটি (OCT) করার পর লিক হওয়া এলাকা নির্ধারণ করে স্বল্প তাপের লেজার চিকিৎসা করা যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে অ্যান্টিভিইজিএফ ইনজেকশন কার্যকরী বলে প্রমাণিত হয়েছে।

চোখে শিরা লিক করে পানি জমা সেরে যাওয়ার পরও ভবিষ্যতে এই সমস্যা আবার হতে পারে, এটাও রোগীকে বুঝতে হবে। তাই দুশ্চিন্তা কমানো ও স্ট্রেসবিহীন জীবনযাপনের অভ্যাস করা জরুরি। সমস্যাটি নিয়ে বেশি দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই। আবার হালকাভাবে নেওয়াও উচিত নয়। মনে রাখতে হবে, এটি চোখের সবচেয়ে সংবেদনশীল এলাকা আক্রান্ত করে। চিকিৎসা না নিলে অনেক সময় ভবিষ্যতে দৃষ্টির স্থায়ী সমস্যা হতে পারে।

লেখক: ডা. আহসান কবির, চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও ফেকো সার্জন, যশোর