চশমার বিকল্প হিসেবে বা চেহারায় পরিবর্তন আনতে কনট্যাক্ট লেন্সের ব্যবহার দিনদিন বাড়ছে। তবে লেন্স পরার পর যদি বারবার চোখ লাল হয়ে যায়, জ্বালা করে বা অস্বস্তি হয়, তবে তা কেবল সাধারণ সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। লেন্সের কারণে চোখে শুষ্কতা, ভুল ব্যবহার, অপরিষ্কার লেন্স বা জীবাণু সংক্রমণের ফলে এমন হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এটি কর্নিয়ায় গুরুতর সংক্রমণ বা কেরাটাইটিসের ইঙ্গিতও দিতে পারে।
কনট্যাক্ট লেন্স সরাসরি চোখের ওপর থাকে। ফলে লেন্স ঠিকমতো পরিষ্কার না থাকলে, সঠিকভাবে না বসলে বা দীর্ঘ সময় পরে থাকলে চোখে সমস্যা তৈরি হতে পারে। চোখ লাল হওয়ার সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে- চোখ শুষ্ক হয়ে যাওয়া, লেন্সের কারণে চোখে ঘর্ষণ বা জ্বালাপোড়া, লেন্স ঠিকমতো না বসা, লেন্স বেশি সময় পরে থাকা, লেন্স পরিষ্কার করার নিয়ম না মানা, লেন্স বা লেন্সের বাক্সে জীবাণু থাকা, অ্যালার্জি বা প্রদাহ এবং চোখের সংক্রমণ।
এফডিএর তথ্য অনুযায়ী, চোখে অস্বস্তি, অতিরিক্ত পানি পড়া, চুলকানি, জ্বালাপোড়া, অস্বাভাবিক লালভাব, ঝাপসা দেখা বা ব্যথা কনট্যাক্ট লেন্সজনিত চোখের সমস্যা বা সংক্রমণের লক্ষণ হতে পারে।
শুধু চোখ লাল হলেই কি বড় সমস্যা?
সব সময় নয়। চোখে সামান্য শুষ্কতা বা অস্বস্তির কারণেও লালভাব দেখা দিতে পারে। কিন্তু কনট্যাক্ট লেন্স ব্যবহারকারীর ক্ষেত্রে লাল চোখের সঙ্গে অন্য উপসর্গ থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। বিশেষ করে চোখে ব্যথা, আলো সহ্য না হওয়া, হঠাৎ ঝাপসা দেখা, অতিরিক্ত পানি পড়া বা চোখ থেকে অস্বাভাবিক তরল বের হলে দ্রুত চোখের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
হতে পারে কর্নিয়ার সংক্রমণ
কনট্যাক্ট লেন্স ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে মাইক্রোবিয়াল কেরাটাইটিস একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। এটি কর্নিয়ায় জীবাণুর সংক্রমণ। ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক বা অ্যামিবার মতো জীবাণু এর কারণ হতে পারে। সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, এই ধরনের সংক্রমণে চোখ লাল হওয়া, চোখে ব্যথা, আলো সহ্য না হওয়া, হঠাৎ ঝাপসা দেখা, অতিরিক্ত পানি পড়া বা চোখ থেকে তরল বের হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে চোখ লাল হওয়ার সঙ্গে ব্যথা বাড়তে থাকলে বিষয়টি জরুরি ভিত্তিতে দেখা প্রয়োজন।
অ্যাকান্থামিবা কেরাটাইটিসও হতে পারে
কনট্যাক্ট লেন্স ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে বিরল হলেও অ্যাকান্থামিবা কেরাটাইটিস নামে গুরুতর কর্নিয়া সংক্রমণ হতে পারে। এতে চোখে ব্যথা, লালভাব, ঝাপসা দেখা, আলোতে অস্বস্তি, চোখে কিছু আটকে থাকার মতো অনুভূতি এবং অতিরিক্ত পানি পড়তে পারে। এই সংক্রমণের লক্ষণ অনেক সময় অন্য সাধারণ চোখের সংক্রমণের মতো মনে হতে পারে। তাই লেন্স ব্যবহারের পর চোখের সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে নিজের মতো করে চোখের ড্রপ ব্যবহার না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
চোখ লাল হলে সঙ্গে সঙ্গে লেন্স খুলে ফেলুন
কনট্যাক্ট লেন্স পরে চোখ লাল হয়ে গেলে লেন্সটি চোখে রেখে দেওয়া উচিত নয়। এফডিএর পরামর্শ অনুযায়ী, চোখ লাল, জ্বালাপোড়া বা দৃষ্টির পরিবর্তন হলে লেন্স খুলে ফেলতে হবে এবং চোখের চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। লাল চোখে আবার নতুন লেন্স পরাও ঠিক নয়। চোখের সমস্যা পুরোপুরি না সারা পর্যন্ত চশমা ব্যবহার করা নিরাপদ বিকল্প হতে পারে।
যেসব ভুলগুলো চোখের ক্ষতি করতে পারে
কনট্যাক্ট লেন্স ব্যবহারের কিছু অভ্যাস চোখের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। চিকিৎসক বিশেষভাবে অনুমতি না দিলে লেন্স পরে ঘুমানো উচিত নয়। ঘুমের সময় লেন্স পরে থাকলে চোখে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। কলের পানি, বোতলের পানি, পুকুর বা অন্য কোনো পানির সংস্পর্শে কনট্যাক্ট লেন্স আনা উচিত নয়। সিডিসি লেন্সকে সব ধরনের পানি থেকে দূরে রাখার পরামর্শ দেয়। বিশেষ করে অ্যাকান্থামিবার মতো জীবাণু পানির মাধ্যমে লেন্সে এসে চোখে সংক্রমণ ঘটাতে পারে। লেন্স ধরার আগে সাবান ও পানি দিয়ে হাত ভালোভাবে ধুয়ে সম্পূর্ণ শুকিয়ে নেওয়া উচিত। নির্ধারিত সময়ের বেশি লেন্স ব্যবহার করলে সংক্রমণ ও চোখের অন্যান্য সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। লেন্স ও লেন্স পরিষ্কারের দ্রবণের প্যাকেটের নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি।
চোখ লাল হলে কখন দ্রুত চিকিৎসা নেবেন?
নিচের যেকোনো লক্ষণ থাকলে কনট্যাক্ট লেন্স খুলে দ্রুত চোখের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত- চোখে মাঝারি বা তীব্র ব্যথা, চোখ লাল হওয়ার সঙ্গে ব্যথা বাড়তে থাকা, হঠাৎ ঝাপসা দেখা, আলো সহ্য না হওয়া, অতিরিক্ত পানি পড়া, চোখ থেকে পুঁজ বা অন্য ধরনের তরল বের হওয়া, চোখে কিছু আটকে থাকার মতো অনুভূতি, চোখের পাতা ফুলে যাওয়া এবং লেন্স খুলে ফেলার পরও সমস্যা না কমা। সিডিসি বিশেষভাবে বলছে, কনট্যাক্ট লেন্স ব্যবহারকারীর চোখ লাল হওয়ার সঙ্গে ব্যথা, আলোতে সংবেদনশীলতা, ঝাপসা দেখা বা অস্বাভাবিক পানি বা তরল বের হলে লেন্স খুলে দ্রুত চোখের চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।
চোখের ড্রপ নিজে থেকে ব্যবহার করবেন?
চোখ লাল হলেই নিজের মতো করে অ্যান্টিবায়োটিক বা স্টেরয়েডযুক্ত চোখের ড্রপ ব্যবহার করা ঠিক নয়। চোখ লাল হওয়ার কারণ একেক জনের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। সংক্রমণ, অ্যালার্জি, শুষ্কতা বা কর্নিয়ার ক্ষত অনুযায়ী চিকিৎসাও আলাদা। তাই সমস্যা যদি তীব্র হয় বা বারবার ফিরে আসে, চোখ পরীক্ষা করানোই নিরাপদ।
কনট্যাক্ট লেন্স ব্যবহারে যে বিষয়গুলো মনে রাখবেন
চোখের সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে কয়েকটি অভ্যাস নিয়মিত মেনে চলা জরুরি। লেন্স ধরার আগে হাত ভালোভাবে ধুয়ে নিন, লেন্স পানির সংস্পর্শে আনবেন না, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া লেন্স পরে ঘুমাবেন না, অন্য কারও লেন্স ব্যবহার করবেন না, নির্ধারিত সময়ের বেশি লেন্স ব্যবহার করবেন না, লেন্স পরিষ্কার ও সংরক্ষণের নিয়ম মেনে চলুন, লেন্সের বাক্স নিয়মিত পরিবর্তন করুন, চোখ লাল বা ব্যথাযুক্ত হলে লেন্স ব্যবহার বন্ধ করুন এবং দৃষ্টির পরিবর্তন হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
কনট্যাক্ট লেন্স চিকিৎসা-সংক্রান্ত একটি যন্ত্র এবং এটি পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। সঠিক পরিচর্যা ও ব্যবহার চোখের সংক্রমণ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ। কনট্যাক্ট লেন্স পরার পর চোখ সামান্য লাল হলেই আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। তবে লালভাব বারবার হলে বা এর সঙ্গে ব্যথা, ঝাপসা দেখা, আলো সহ্য না হওয়া কিংবা চোখ দিয়ে পানি বা তরল পড়ার মতো লক্ষণ থাকলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ সাধারণ জ্বালাপোড়া থেকে শুরু করে কর্নিয়ার গুরুতর সংক্রমণ পর্যন্ত বিভিন্ন কারণে চোখ লাল হতে পারে। তাই চোখ লাল হলে প্রথমেই লেন্স খুলে ফেলুন এবং গুরুতর বা স্থায়ী উপসর্গ থাকলে দ্রুত চোখের চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সূত্র: এনডিটিভি