কাজের চাপ বা মানসিক উত্তেজনায় অনেকেই চোখে অস্বস্তি অনুভব করেন। কখনো পাতা কাঁপে, কখনো শুষ্কতা বা দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যায়। অনেক সময় মানুষ ভাবেন চোখের পাওয়ার বেড়েছে বা নতুন কোনো সমস্যা তৈরি হয়েছে। তবে চিকিৎসকেরা বলছেন, মানসিক চাপ বা স্ট্রেসও সাময়িকভাবে দৃষ্টির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। স্ট্রেসের সময় শরীরে শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন ঘটে, যা চোখের ফোকাস, অশ্রুস্তর ও চারপাশের পেশির ওপর প্রভাব বিস্তার করে। তবে দৃষ্টি ঝাপসা হলেই তা শুধু মানসিক চাপের ফল বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়; এর পেছনে চোখের গুরুতর কোনো রোগ লুকিয়ে থাকতে পারে।

মানসিক চাপের সময় শরীর ‘ফাইট-অর-ফ্লাইট’ রেসপন্স মোডে প্রবেশ করে। এই অবস্থায় চোখের মণি কিছুটা বড় হয়ে যায়, যার ফলে আলো প্রবেশের স্বাভাবিক ধরণ বদলে যায়। যাদের আগে থেকেই হালকা পাওয়ারের সমস্যা বা অ্যাস্টিগমেটিজম রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে তখন সাময়িকভাবে ঝাপসা দেখা বা দেখতে সমস্যা হতে পারে। এ ছাড়া মানসিক চাপের সময় অনেকেই দীর্ঘক্ষণ মোবাইল বা কম্পিউটার স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকেন। ফলে চোখের পলক পড়ার হার কমে যায় এবং অশ্রুস্তর দ্রুত শুকিয়ে যায়, যা ঝাপসা বা ওঠানামা করা দৃষ্টির কারণ হয়।

চোখের পাতা হঠাৎ কাঁপতে শুরু করলেও তা স্ট্রেসের একটি সাধারণ লক্ষণ হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে মায়োকাইমিয়া (myokymia) বলা হয়। ঘুমের ঘাটতি, অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ এবং দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে এই কাঁপুনির সম্পর্ক রয়েছে। সাধারণত এটি ক্ষতিকর নয় এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুমের মাধ্যমে কয়েক দিনের মধ্যেই কেটে যায়। তবে চোখের পাতা কাঁপার পাশাপাশি মুখের নিচের অংশেও কাঁপুনি শুরু হলে বা চোখ ইচ্ছার বিরুদ্ধে শক্ত করে বন্ধ হয়ে আসলে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা প্রয়োজন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ চোখের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, সেন্ট্রাল সেরাস কোরিওরেটিনোপ্যাথি বা সিএসসিআর (CSCR) নামক চোখের রোগের সাথে স্ট্রেসের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। এই রোগে রেটিনার কেন্দ্রীয় অংশের নিচে তরল জমে যায়, যার ফলে দৃষ্টির মাঝখানে ঝাপসা বা কালচে দাগ দেখা দেয়, সরল রেখা বাঁকা মনে হয় বা বস্তুর আকার বিকৃত লাগে। পাশাপাশি, কর্টিকোস্টেরয়েড বা স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ সেবনের সাথেও এই রোগের ঝুঁকি যুক্ত। স্টেরয়েড ট্যাবলেট, ত্বকের ক্রিম, নাকের স্প্রে, অ্যাজমার ইনহেলার বা ইনজেকশনের মাধ্যমেও দেওয়া হতে পারে। তাই এই ধরনের ওষুধ সেবনকারীদের চিকিৎসককে অবহিত করা জরুরি।

স্ট্রেসের সময় কারও কারও চোখের সামনে ঝিকিমিকি আলো, জিগজ্যাগ রেখা বা সাময়িক অন্ধকার দেখা দিতে পারে। অনেকেই একে চোখের সমস্যা মনে করলেও এটি ভিজুয়াল অরা বা মাইগ্রেন অরা-এর লক্ষণ হতে পারে। এটি মূলত একটি স্নায়বিক ঘটনা এবং সবসময় চোখের রোগের কারণে হয় না। সাধারণত এই উপসর্গ সাময়িক হয় এবং কিছুক্ষণ পরেই কেটে যায়। তবে প্রথমবার এমন লক্ষণ দেখা দিলে বা উপসর্গের ধরণ বদলে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ।

সকল ধরনের ঝাপসা দৃষ্টি স্ট্রেসের কারণে হয় না। হঠাৎ দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গেলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। বিশেষ করে নিচের যেকোনো লক্ষণ থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি: হঠাৎ এক বা দুই চোখে দৃষ্টি কমে যাওয়া; একটি চোখে নতুন করে ঝাপসা দেখা; চোখের সামনে কালো পর্দা বা ছায়া নেমে আসার অনুভূতি; দৃষ্টির মাঝখানে কালো বা ধূসর দাগ দেখা; সরল রেখা বা দরজার ফ্রেম বাঁকা দেখা; চোখে তীব্র ব্যথার সঙ্গে দৃষ্টি ঝাপসা হওয়া; নতুন করে অনেক ফ্লোটার্স বা আলোর ঝলকানি দেখা। হঠাৎ দৃষ্টির পরিবর্তন চোখ বা স্নায়ুতন্ত্রের জরুরি সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। তাই শুধু বিশ্রাম নিয়ে অপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

চোখের উপসর্গের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ বা ঘুমের ঘাটতি থাকলে জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। পর্যাপ্ত ঘুম চোখের ক্লান্তি কমাতে সাহায্য করে। দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিন ব্যবহারের মাঝে নিয়মিত বিরতি নেওয়া জরুরি। ২০-২০-২০ নিয়ম অনুসরণ করা যেতে পারে, অর্থাৎ প্রতি ২০ মিনিট পর অন্তত ২০ ফুট দূরের কোনো কিছুর দিকে ২০ সেকেন্ড তাকানো। স্ক্রিনে কাজ করার সময় সচেতনভাবে চোখের পলক ফেললে পৃষ্ঠ আর্দ্র থাকে। অতিরিক্ত চা বা কফি ক্যাফেইন চোখের পাতা কাঁপার সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে, তাই তা কমানো উচিত। নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম এবং কাজের মধ্যে বিরতি মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। চোখ শুষ্ক লাগলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ড্রপ ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে আই ড্রপ ব্যবহার করে দৃষ্টির নতুন বা দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন উপেক্ষা করা উচিত নয়।

দৃষ্টি ঝাপসা হওয়ার পেছনে চোখের পাওয়ারের পরিবর্তন, ড্রাই আই, চোখের ক্লান্তি, ডায়াবেটিস বা মাইগ্রেনসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা থাকতে পারে। তাই মানসিক চাপের সময় সাময়িকভাবে দৃষ্টি অস্পষ্ট মনে হলে বিশ্রাম ও ঘুমের দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু সমস্যা বারবার হলে, দীর্ঘস্থায়ী হলে বা হঠাৎ শুরু হলে চোখের বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। স্ট্রেস সত্যিই চোখের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, তবে দৃষ্টি ঝাপসা হলেই তা স্ট্রেসের কারণে হয়েছে বলে ধরে নেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। বিশেষ করে এক চোখে হঠাৎ দৃষ্টি পরিবর্তন, কালো বা ধূসর দাগ, সরল রেখা বাঁকা দেখা কিংবা হঠাৎ দৃষ্টি কমে গেলে দ্রুত চোখের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
সূত্র: এনডিটিভি