আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা এই রঙিন পৃথিবীকে কেউ কেউ ধূসর হিসেবে দেখেন। অনেকের ক্ষেত্রে লাল ও সবুজের মধ্যকার পার্থক্য বোঝা অসম্ভব হয়ে পড়ে। কেন এমনটি ঘটে, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।

বিষয়টি বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হবে আমরা বস্তুকে রঙিন দেখি কেন। সূর্যের আলো মূলত রংধনুর সাতটি রঙের সমন্বয়ে গঠিত, যার সম্মিলিত রূপ হলো সাদা। যখন দিনের আলো কোনো বস্তুর ওপর পড়ে, তখন সেই বস্তুটি সূর্যের আলোর নির্দিষ্ট কিছু রং শুষে নেয় এবং বাকি রংগুলো বিচ্ছুরিত হয়ে আমাদের চোখে এসে পড়ে।

চোখের সংবেদনশীল স্তর বা রেটিনাতে বিশেষ ধরনের স্নায়ুকোষ থাকে, যাকে ফটোরিসেপ্টর বলা হয়। এই কোষগুলো বিশেষ সিগন্যালের মাধ্যমে রঙিন বার্তাটি মস্তিষ্কে প্রেরণ করে। এরপর মস্তিষ্ক বিশ্লেষণ করে বলে দেয় যে বস্তুটি লাল, সবুজ কিংবা অন্য কোনো রঙের। সহজভাবে বললে, রঙের উৎস হলো সূর্য, চোখের বিশেষ ফটোরিসেপ্টর বা ‘কোণ সেল’ এখানে অ্যান্টেনা হিসেবে কাজ করে এবং মস্তিষ্কে এর চূড়ান্ত অনুভূতি তৈরি হয়।

চোখের সাথে মস্তিষ্কের সংযোগকারী স্নায়ু বা অপটিক নার্ভ মূলত রঙের বার্তাবাহক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। কোনো বিশেষ কারণে যদি এই অপটিক নার্ভ কিংবা বার্তাবাহক স্নায়ুগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে রঙিন অনুভূতি বিলুপ্ত হয়ে যায়। এই অবস্থাকেই বলা হয় কালার ব্লাইন্ড বা বর্ণান্ধতা। উল্লেখ্য যে, দৃষ্টিশক্তি ভালো থাকলেও একজন ব্যক্তি বর্ণান্ধ হতে পারেন।

কালার ব্লাইন্ড বা রং বুঝতে না পারা সব সময় একটি সমস্যা হিসেবে গণ্য হয় না। অনেকের ক্ষেত্রে এই বর্ণান্ধতা জন্মগত অথবা জেনেটিক ত্রুটির কারণে হয়ে থাকে। এই ধরনের ব্যক্তিরা সাধারণত লাল ও সবুজের পার্থক্য বুঝতে পারেন না। জন্মগত বর্ণান্ধতার কোনো চিকিৎসা নেই এবং এতে তাঁদের দৃষ্টিশক্তির কোনো সমস্যাও থাকে না। যদিও দৈনন্দিন সাধারণ কাজে কোনো বিঘ্ন ঘটে না, তবে এঁরা ড্রাইভিং, ড্রয়িং ডিজাইন, সিগন্যালিং, স্ক্রিন বা মাইক্রোস্কোপের মতো রং-নির্ভর কাজগুলো সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে পারেন না।

অন্যদিকে, একজন সম্পূর্ণ সুস্থ ব্যক্তিও হঠাৎ করে কালার ব্লাইন্ড হয়ে যেতে পারেন। এর পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে, যেমন— অপটিক নিউরাইটিস বা অপটিক নার্ভে প্রদাহ, স্ট্রোক, মস্তিষ্কের টিউমার কিংবা নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। এছাড়া অতিমাত্রায় অ্যালকোহল বা মদের বিষক্রিয়ার ফলেও এমনটি হতে পারে।

এই ধরনের ক্ষেত্রে কোণ ফটোরিসেপ্টর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে নার্ভের প্রদাহ, বিষক্রিয়া বা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে বর্ণান্ধতা হলে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ করে তা সারিয়ে তোলা সম্ভব। এক্ষেত্রে অত্যন্ত জরুরি যে, লক্ষণ প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চিকিৎসা নিতে হবে।

তথ্যসূত্র: অধ্যাপক ডা. মো. ছায়েদুল হক, চক্ষুবিশেষজ্ঞ, উপাধ্যক্ষ, মার্কস মেডিকেল কলেজ, মিরপুর, ঢাকা।